সম্পাদকীয়:
কিশোর গ্যাং এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু কিশোরের বেপরোয়া আচরণের নাম নয়। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ অপরাধ, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, মারামারি ও আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে কিশোরদের সম্পৃক্ততার খবর উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। কিন্তু এই বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অনেক সময় আড়ালে থেকে যায়, কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে, কিন্তু তাদের সেই পথে নিয়ে যাচ্ছে কারা?
একজন কিশোর একা একটি অপরাধী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে না। তার হাতে অস্ত্র পৌঁছায় কীভাবে, অপরাধের পর সে কোথায় আশ্রয় পায়, মামলা হলে কে তাকে ছাড়িয়ে আনে, এলাকায় কার নাম ব্যবহার করে সে ভয় দেখায়, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারলেই কিশোর গ্যাং সমস্যার প্রকৃত চিত্র সামনে আসবে।
অভিজ্ঞতা বলছে, অপরাধী চক্রের নেপথ্যে থাকা বড়দের ছত্রচ্ছায়া থাকলে কিশোরদের দিয়ে অপরাধ করানো তুলনামূলক সহজ। বয়স কম হওয়ায় তাদের ব্যবহার করা যায়, আবার অনেক ক্ষেত্রে তারা আইন ও সামাজিক পরিণতি সম্পর্কেও পুরোপুরি সচেতন নয়। ফলে কিশোর হয়ে ওঠে অপরাধের দৃশ্যমান মুখ, আর প্রকৃত নিয়ন্ত্রক থেকে যায় পর্দার আড়ালে। এখানেই আইন প্রয়োগের বড় চ্যালেঞ্জ।
কোনো এলাকায় কয়েকজন কিশোরকে আটক করে সংবাদ সম্মেলনে দেখানো গেলেই অভিযান সফল হয় না। বরং দেখতে হবে, তাদের পেছনে কোনো বড় ভাই, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী কেউ কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র আছে কি না। থাকলে সেই নেটওয়ার্কের অর্থের উৎস, যোগাযোগ, অস্ত্রের সরবরাহ এবং রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের পথও অনুসন্ধান করতে হবে।
কিশোর অপরাধের আরেকটি দিকও উপেক্ষা করা যাবে না। পারিবারিক নজরদারির অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, মাদক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার এবং দ্রুত অর্থ ও ক্ষমতা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা অনেক তরুণকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কিন্তু এসব কারণ অপরাধের ব্যাখ্যা হতে পারে, অপরাধের বৈধতা নয়। একজন কিশোরকে অপরাধ থেকে ফেরানোর দায়িত্ব যেমন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের; তেমনি তাকে অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো রাজনৈতিক পরিচয়ের অপব্যবহার। সরকার বা রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের সঙ্গে যদি অপরাধীদের পরিচয়ও বদলে যায়, কিন্তু অপরাধের কর্মকাণ্ড একই থাকে, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল কোনো একটি দল বা সময়ের নয়। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় অপরাধ করার সুযোগ তৈরি হওয়াটাই মূল সমস্যা।
তাই কোনো দলের নাম দেখে নয়, অপরাধের প্রমাণ দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। আজ যে অপরাধী একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয়ে আছে, কাল সে অন্য পরিচয় ব্যবহার করতে পারে। অপরাধীর দল বদলাতে পারে; কিন্তু আইন প্রয়োগের নীতি বদলানো উচিত নয়।
এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারিত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কিশোরকে গ্রেপ্তার করা সহজ; তার পেছনের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা কঠিন। সহজ কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে অপরাধের মূল কাঠামো অক্ষত থাকবে। ফলে একই এলাকায় নতুন কিশোর, নতুন দল এবং নতুন নামে পুরোনো অপরাধ আবার ফিরে আসবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। ছাত্র বা যুব সংগঠনের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, দখল কিংবা সন্ত্রাসে জড়ায়, তাকে দলীয় পরিচয় দিয়ে রক্ষা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সাংগঠনিক পদ বা রাজনৈতিক যোগাযোগ যেন আইন থেকে রেহাই পাওয়ার ঢাল না হয়—এ নিশ্চয়তা দিতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই।
তবে কেবল শাস্তি দিয়ে কিশোর অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নয়। যে কিশোর আজ অপরাধী হিসেবে পুলিশের খাতায় উঠছে, সে একসময় একটি পরিবারের সন্তান, একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সমাজেরই সদস্য ছিল। তাই ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষায় ফিরিয়ে আনা, কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর তৈরি করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করা জরুরি।
পাড়া-মহল্লায় মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই, নিরাপদ বিনোদনের সুযোগ নেই—আর সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় অপরাধী গোষ্ঠী। সেখানে কিশোরদের কাছে অপরাধী ‘বড় ভাই’ হয়ে ওঠে। এই সামাজিক বাস্তবতা পরিবর্তন না করে শুধু পুলিশের অভিযান চালালে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।
সবচেয়ে বড় কথা, কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু ‘কিশোর ধরার অভিযান’ বানানো যাবে না। এটি হতে হবে অপরাধের পুরো সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার অভিযান। কে অর্থ দিচ্ছে, কে নির্দেশ দিচ্ছে, কে অস্ত্র বা মাদক সরবরাহ করছে, কে রাজনৈতিক বা সামাজিক আশ্রয় দিচ্ছে এবং অপরাধের পর কে তাদের রক্ষা করছে—প্রতিটি স্তর তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
কিশোরদের অপরাধ থেকে ফিরিয়ে আনা মানবিক দায়িত্ব; আর তাদের অপরাধে ব্যবহারকারী প্রাপ্তবয়স্কদের বিচারের মুখোমুখি করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটি করলে সমস্যার সমাধান হবে না।
আজ যে কিশোরকে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, আগামীকাল সে নিজেই আরও বড় অপরাধের অংশ হয়ে উঠতে পারে। তাই সময় থাকতে হাতিয়ারটিকে শুধু ভাঙলেই হবে না—যে হাত সেই হাতিয়ারটি পরিচালনা করছে, সেই হাতটিকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। এটাই কিশোর গ্যাং দমনের সবচেয়ে কার্যকর পথ।


