রায়হান আহমেদ:
ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনায় জীবনযাপন পরিবর্তনের গুরুত্ব নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। তবে জীবনযাপন পরিবর্তনের সঙ্গে ওষুধের ব্যবহার, বিশেষ করে ইনসুলিন, কীভাবে সমন্বয় করা হবে, তা নিয়ে মতভেদও রয়েছে। একইভাবে কিটো ডায়েট, কফি এনেমা ও বিভিন্ন সাপ্লিমেন্টের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
জেকে লাইফস্টাইলের চেয়ারম্যান ডা. জাহাঙ্গীর কবিরের বিভিন্ন পরামর্শ নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচকদের একটি অংশের অভিযোগ, তিনি জীবনযাপন পরিবর্তনকে কখনো কখনো ওষুধের বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে তাঁর বক্তব্য, তিনি ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধের পরামর্শ দেন না; বরং রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসার পাশাপাশি জীবনযাপনের পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেন। এই বিতর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন তিনি।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: আপনার চিকিৎসা-পদ্ধতি নিয়ে সবচেয়ে বড় বিতর্কটি কোথায় বলে মনে করেন?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: আমার মনে হয় মূল সমস্যা হচ্ছে আমাদের কাজকে সঠিকভাবে বোঝা হচ্ছে না। আমরা জীবনযাপনকে চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখি। খাবার, ব্যায়াম, ঘুম ও দৈনন্দিন অভ্যাস মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা ওষুধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করি। একজন রোগীর যদি ওষুধ প্রয়োজন হয়, তাঁকে ওষুধ নিতে হবে। জরুরি অবস্থায় থাকা রোগীকে ওষুধ ছাড়া চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। আমাদের কাজ হলো জীবনযাপনের পরিবর্তনের মাধ্যমে যেসব ঝুঁকি কমানো সম্ভব, সেগুলো কমানোর চেষ্টা করা।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ, আপনার পরামর্শ অনুসরণ করতে গিয়ে কেউ কেউ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে দূরে সরে যেতে পারেন। রোগীর নিরাপত্তার বিষয়টি কীভাবে দেখেন?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: রোগীর নিরাপত্তা অবশ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আমরা কাউকে নিজের ইচ্ছায় ওষুধ বা ইনসুলিন বন্ধ করতে বলি না। কোনো রোগীর চিকিৎসা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে সেটি চিকিৎসকের মূল্যায়নের ভিত্তিতেই হওয়া উচিত।
বিশেষ করে ইনসুলিনের ক্ষেত্রে রোগীর অবস্থা, রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা, অন্যান্য শারীরিক সমস্যা, সবকিছু বিবেচনা করতে হয়। তাই ‘ইনসুলিন বন্ধ করে দিন’—এমন কোনো সাধারণ পরামর্শ আমাদের নয়।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: একটি রোগীকে ইনসুলিন বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। আপনারা বিষয়টি তদন্ত করে কী পেয়েছেন?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: আমরা পরে বিষয়টি খতিয়ে দেখেছি। যে রোগীর কথা বলা হচ্ছে, তাঁকে আমরা ইনসুলিন বন্ধ করতে বলেছি, এমন কোনো প্রমাণ পাইনি। রোগীটি আমাদের প্রতিষ্ঠানে এসেছিলেন এবং একজন চিকিৎসক তাঁকে দেখেছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে তাঁকে দেখিনি।
তাঁর আগের প্রেসক্রিপশনও আমরা পর্যালোচনা করেছি। সেখানে দুটি ডায়াবেটিসের ওষুধের উল্লেখ ছিল, কিন্তু ইনসুলিনের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। আমাদের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, ইনসুলিন বন্ধ করার অভিযোগের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: তাহলে ইনসুলিন নিয়ে আপনার অবস্থান এক বাক্যে কী?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: যাঁর ইনসুলিন প্রয়োজন, তাঁর ইনসুলিন প্রয়োজন। আমরা ইনসুলিন বন্ধ করতে বলিনি। রোগীর অবস্থার উন্নতি হলে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ডোজ সমন্বয় করা যেতে পারে, কিন্তু সেটি রোগীভেদে সিদ্ধান্তের বিষয়।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: কিটো ডায়েট নিয়ে আপনাকে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। আপনি কি আসলে কিটো ডায়েটের পক্ষে?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: আমাকে ‘কিটো ডায়েট’ দেওয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি এত সরল নয়। আমরা রোগীর খাদ্যাভ্যাস তাঁর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী বিবেচনা করি।
যাঁদের রক্তে শর্করা বেশি, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ কমানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ সবার জন্য ভাত বা রুটি নিষিদ্ধ করে দেওয়া নয়। একজন কৃষক সারাদিন শারীরিক পরিশ্রম করেন, তাঁর খাদ্যচাহিদা আর একজন অফিসকর্মীর খাদ্যচাহিদা এক হবে না।
তাই কোনো একটি ডায়েটকে সবার জন্য একইভাবে প্রয়োগ করার বিষয়টি আমি সমর্থন করি না।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: কফি এনেমা নিয়ে আপনার বক্তব্যের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি কতটা শক্ত?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: কফি এনেমা নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কিছু রোগী এর ব্যবহারে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তবে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর বড় পরিসরের বৈজ্ঞানিক গবেষণা এক জিনিস নয়।
আমি মনে করি, এ বিষয়ে আরও গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। কফি এনেমাকে সব রোগের চিকিৎসা হিসেবে দেখার বিষয়টিও আমি বলছি না।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: তাহলে ‘ডিটক্স’ শব্দটি ব্যবহার করা কতটা বৈজ্ঞানিক?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: ‘ডিটক্স’ শব্দটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে কোনো চিকিৎসা-পদ্ধতির কার্যকারিতা নির্ধারণ করতে হলে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রমাণ প্রয়োজন। আমাদের নিজেদের পর্যবেক্ষণকে বড় বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিকল্প বলা যাবে না।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: সাপ্লিমেন্ট নিয়েও আপনার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির নামে বিভিন্ন পণ্যের প্রচারণা দেখা যায়।
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: আমাদের নামে অনেক ভুয়া পেজ বিজ্ঞাপন দেয়। যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির নামে যেসব বিজ্ঞাপন আমাদের প্রতিষ্ঠানের নামে প্রচার করা হয়, সেগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নেই।
আমরা কিছু প্রাকৃতিক উপাদানভিত্তিক পণ্য বিক্রি করি। কিন্তু কোনো একটি পণ্য গ্রহণ করলেই যৌনক্ষমতা বেড়ে যাবে, এমন দাবি আমরা করি না। শারীরিক সক্ষমতার সঙ্গে ঘুম, ব্যায়াম, খাদ্যাভ্যাস ও সামগ্রিক জীবনযাপনের সম্পর্ক রয়েছে।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: সমালোচকেরা বলছেন, আপনার জনপ্রিয়তার কারণে মানুষ আপনার বক্তব্যকে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনের মতো গ্রহণ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে আপনার দায় কোথায়?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: এটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন মানুষ যদি কোনো বক্তব্য শুনে নিজের চিকিৎসা নিজে পরিবর্তন করেন, সেটি ঠিক নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বাস্থ্যবিষয়ক কোনো তথ্য দেখেই ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলি, সেগুলো মানুষকে সচেতন করার জন্য। কিন্তু ব্যক্তিগত চিকিৎসার সিদ্ধান্ত ব্যক্তির চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করেই নিতে হবে।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর ডট নিউজ: তাহলে আপনার পদ্ধতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা কী?
ডা. জাহাঙ্গীর কবির: মানুষকে শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা নেওয়ার চিন্তা করলে হবে না। রোগ প্রতিরোধেও জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম ও মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ—এসবকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে জীবনযাপন পরিবর্তনকে ওষুধের বিকল্প হিসেবে দেখার বিষয়টি ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে ওষুধ নিতে হবে, প্রয়োজন হলে ইনসুলিন নিতে হবে। আমার কাজ হলো রোগীকে জীবনযাপন ঠিক করার মাধ্যমে যতটা সম্ভব সুস্থ থাকার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া।


