Homeবিবিধঅপরাধমাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষায় তদারকির ঘাটতি, অভিযোগ তদন্তে নতুন উদ্যোগ

মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষায় তদারকির ঘাটতি, অভিযোগ তদন্তে নতুন উদ্যোগ

তানভীর রায়হান:

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় আদালতের নির্দেশনা, সরকারি তদারকি কাঠামো ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনা কমিটি, সবই রয়েছে। এরপরও দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ, শিক্ষক গ্রেপ্তার এবং অভিযোগ জানিয়েও প্রতিকার না পাওয়ার ঘটনা সামনে আসছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক সময়ে গাজীপুর, কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম ও পাবনায় বিভিন্ন মাদ্রাসার শিক্ষক বা পরিচালকের বিরুদ্ধে শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন নিপীড়ন, ধর্ষণচেষ্টা ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

গাজীপুরের টঙ্গী ও গাছা এলাকার দুটি কওমি মাদ্রাসায় শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানির অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। গাছার একটি মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, পরিবার বিষয়টি জানানোর পরও অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। এ অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে নয় বছর বয়সী এক ছাত্রীর বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে এক শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতেও আট বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের অভিযোগে একটি মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়। পাবনায় এক মহিলা কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন নির্যাতন ও ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ ঘিরেও উত্তেজনা তৈরি হয়।

শুধু কওমি মাদ্রাসা নয়, আলিয়া ধারার প্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যৌন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় একটি দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষকের বিরুদ্ধে ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এসব ঘটনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ গ্রহণ, তদন্ত ও প্রতিরোধব্যবস্থা কার্যকর রাখার গুরুত্ব সামনে এনেছে।

ফ্রান্সভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিসমেকার্স বাংলাদেশ ইন ফ্রান্সের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছেলেশিশুদের বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ১৩১টি ঘটনায় ১৭১ জন ভুক্তভোগীর তথ্য নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে মাদ্রাসায় সংঘটিত ৭২টি ঘটনায় ১০৯ জন ছেলেশিশু ভুক্তভোগী হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় ৮১ জন মাদ্রাসাশিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশে ১১৮ শিশু ধর্ষণের শিকার এবং ৪৬ শিশু ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে।

তবে এসব পরিসংখ্যান দিয়ে দেশের মাদ্রাসাগুলোতে যৌন নির্যাতনের সামগ্রিক হার নির্ধারণ করা যায় না। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনা ও নিজস্ব পর্যবেক্ষণনির্ভর। প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব না থাকায় মাদ্রাসায় এ ধরনের অপরাধের প্রকৃত ব্যাপ্তি নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

২০০৯ সালের ১৪ মে হাইকোর্ট কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নির্দেশনা দেন। এতে অভিযোগ কমিটি গঠন, অভিযোগ যাচাই, তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কমিটির প্রধান নারী হওয়া এবং প্রতিষ্ঠানের বাইরের অন্তত দুজন সদস্য রাখার নির্দেশনাও রয়েছে।

বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল অধিভুক্ত মাদ্রাসাগুলোতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেয়। এর আগে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরও এ বিষয়ে নোটিশ জারি করেছিল।

কিন্তু নির্দেশনা থাকা আর তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। কোনো প্রতিষ্ঠানে কমিটি রয়েছে কি না, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি জানেন কি না এবং অভিযোগ পাওয়ার পর নিরপেক্ষ তদন্ত হয় কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চিত করা জরুরি।

আলিয়া ধারার মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের তদারকির আওতায় থাকলেও কওমি মাদ্রাসাগুলো নিজস্ব শিক্ষা বোর্ড ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হয়। ফলে দুই ধারার প্রতিষ্ঠানের তদারকি কাঠামো এক নয়। বিশেষ করে কওমি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা, অভিযোগ তদন্ত এবং বোর্ডের জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মুহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান জানিয়েছেন, যৌন নির্যাতন প্রতিরোধে নিয়মিত নির্দেশনা দেওয়া হয় এবং উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাদের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে তদারকি করা হয়। তবে অধিদপ্তরের নিজস্ব মাঠপর্যায়ের সরাসরি তদারকির ব্যবস্থা নেই। তিনি এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে মনিটরিং আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন।

সাম্প্রতিক অভিযোগগুলোর মধ্যে কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী সুরক্ষার বিষয়ে নতুন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। সংগঠনটির ২৪ অক্টোবরের বিবৃতিতে বলা হয়, ছয়টি কওমি মাদ্রাসা বোর্ড এবং তাদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থী সুরক্ষা কমিটি গঠন বা সচল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিবৃতি অনুযায়ী, শিক্ষার্থী নিপীড়ন বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ সর্বোচ্চ সাত দিনের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বোর্ডগুলোর অধীনে শক্তিশালী মনিটরিং সেল এবং অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন চালুর নির্দেশনার কথাও জানানো হয়। সংগঠনটি আরও বলেছে, কোনো প্রতিষ্ঠান সুরক্ষা কমিটি গঠন না করলে বা অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে অধিভুক্তি স্থগিত কিংবা বাতিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।

ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন (কায়কোবাদ) ২৪ অক্টোবর রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের বলেন, মাদ্রাসায় এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক ও লজ্জাজনক। ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

শিশু শিক্ষার্থীরা ভয়, লজ্জা, সামাজিক চাপ কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির প্রভাবের কারণে অনেক সময় নির্যাতনের কথা জানাতে পারে না। আবাসিক প্রতিষ্ঠানে পরিবার থেকে দূরে থাকার কারণে তাদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। অভিযোগ জানানোর পর প্রতিকার না পাওয়ার আশঙ্কাও শিক্ষার্থীদের নীরব থাকতে বাধ্য করতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে শুধু কমিটি গঠন বা নির্দেশনা জারি যথেষ্ট নয়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ জানানোর পদ্ধতি জানানো, গোপনীয়তা রক্ষা, নিরপেক্ষ তদন্ত, নিয়মিত পরিদর্শন এবং অভিযোগ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি পৌঁছানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

মাদ্রাসা পরিচালনা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব শৃঙ্খলাব্যবস্থা থাকলেও যৌন অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অভিযোগের তদন্ত ও বিচার শেষ হওয়ার আগে কাউকে দোষী সাব্যস্ত না করে ভুক্তভোগী শিশুর নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করতে হবে।

সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শিশু সুরক্ষার বিদ্যমান ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর, তা যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে। অভিযোগ কমিটি, হটলাইন ও মনিটরিং সেল কতটা কার্যকরভাবে চালু হয় এবং অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা যায় কি না, তার ওপরই এসব উদ্যোগের বাস্তব ফল নির্ভর করবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments