Homeবিবিধসম্পাদকীয়নৈতিকতার নামে নির্যাতন, বিচারের অধিকার কার?

নৈতিকতার নামে নির্যাতন, বিচারের অধিকার কার?

সম্পাদকীয়:

সমাজে নৈতিকতার প্রশ্নে মানুষ প্রায়ই অন্যের বিচারক হয়ে ওঠে। কারও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে সেই সন্দেহকে সত্য ধরে নেওয়া, সামাজিকভাবে হেয় করা কিংবা শাস্তি দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। কিন্তু একটি সভ্য সমাজে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে অপমান বা নির্যাতন করার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। বিচার করার দায়িত্ব আদালতের, আর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া নিজেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হতে পারে। ঝিনাইদহ সদর উপজেলার একটি গ্রামে পরকীয়ার অভিযোগে এক নারীকে মারধর, চুল কেটে দেওয়া এবং শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখানোর ঘটনা সেই বিপজ্জনক প্রবণতাকেই সামনে এনেছে।

প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ২২ অক্টোবর ঝিনাইদহের করোতিপাড়া গ্রামে ওই নারীকে পরকীয়ার অভিযোগে নির্যাতন করা হয়। অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা আইনের আশ্রয় নেওয়ার পরিবর্তে কয়েকজন ব্যক্তি নিজেরাই বিচার ও শাস্তি দেওয়ার পথ বেছে নেন। মাকে রক্ষা করতে গিয়ে তাঁর ছেলেও লাঠির আঘাতে আহত হয়। অভিযোগটি সত্য না মিথ্যা, তা নির্ধারণের আগেই একজন নারী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ওপর এমন আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এখানে প্রশ্ন শুধু একজন নারীর ওপর নির্যাতনের নয়; প্রশ্ন হলো, সমাজে বিচারব্যবস্থার জায়গায় ব্যক্তিগত প্রতিশোধ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে কি না। কেউ কোনো অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়েছেন বলে সন্দেহ হলে তাঁর বাড়িতে গিয়ে হামলা চালানো, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা কিংবা প্রকাশ্যে অপমান করার অধিকার কারও নেই। অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ সংগ্রহ এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেসব ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা ন্যায়বিচার নয়, বরং আইনের শাসনের প্রতি সরাসরি অবজ্ঞা।

পরকীয়া নিয়ে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই একটি অসম চিত্র দেখা যায়। কোনো নারীকে ঘিরে অভিযোগ উঠলে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, চরিত্র ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনা শুরু হয়। কখনো তাঁকে অপমান করা হয়, কখনো তাঁর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। কিন্তু একই অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুরুষের ভূমিকা, দায় কিংবা আচরণ নিয়ে সমানভাবে প্রশ্ন তোলা হয় কি না, তা ভেবে দেখা জরুরি।

ঝিনাইদহের ঘটনায় অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুরুষের স্ত্রীর হাতে ওই নারীর চুল কেটে দেওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ব্যক্তিগত ক্ষোভ, দাম্পত্য সংকট কিংবা মানসিক আঘাত—কোনোটিই অন্য একজন মানুষের মর্যাদা কেড়ে নেওয়ার বৈধ কারণ হতে পারে না। কারও আচরণে ক্ষুব্ধ হলে প্রতিকার চাওয়ার পথ আছে; প্রতিশোধ নেওয়ার নামে নির্যাতনের অধিকার নেই।

নারীর প্রতি সহিংসতাকে সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার উপায় হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও বিপজ্জনক। চুল কেটে দেওয়া, শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখানো কিংবা মারধর করার মধ্য দিয়ে কোনো নৈতিক আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয় না। বরং এসব আচরণ মানুষের মৌলিক মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে অস্বীকার করে।

বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারায় ব্যভিচারসংক্রান্ত একটি অপরাধের বিধান রয়েছে। তবে ধারাটির প্রয়োগের ক্ষেত্র নির্দিষ্ট এবং এতে সংশ্লিষ্ট পুরুষের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকলেও নারীকে ওই অপরাধে সহায়তাকারী বা অপরাধী হিসেবে শাস্তি দেওয়ার বিধান নেই। এ ধারার আওতায় সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে আইন কীভাবে প্রযোজ্য হবে, তা নির্ভর করে অভিযোগের প্রকৃতি ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ওপর।

এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্যভিচারসংক্রান্ত আইনি বিধান থাকলেও তা কাউকে ব্যক্তিগতভাবে শাস্তি দেওয়ার অনুমতি দেয় না। অভিযোগ সত্য হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ মিথ্যা হলে অপবাদ ছড়ানো বা নির্যাতনের জন্য দায়ীদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

একইভাবে, কাউকে মারধর করা, ভয়ভীতি দেখানো, অপমান করা কিংবা তাঁর শরীরে মরিচের গুঁড়া মাখানোর মতো আচরণেরও আইনি পরিণতি হতে পারে। এসব অভিযোগের তদন্ত করে প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। সামাজিকভাবে কেউ দোষী বিবেচিত হলেই তিনি আইনের ঊর্ধ্বে উঠে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেন না।

গ্রামবাংলায় সামাজিক সালিশের দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। স্থানীয় বিরোধ মীমাংসায় তা কখনো কার্যকর ভূমিকা রাখলেও সালিশের নামে কাউকে মারধর, অপমান বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে নারী-পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কের অভিযোগকে কেন্দ্র করে জনতার বিচার প্রতিষ্ঠা করা হলে তা সহজেই প্রতিহিংসা, ক্ষমতার অপব্যবহার ও সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।

এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সামাজিক সচেতনতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে—নৈতিকতার দোহাই দিয়ে কাউকে নির্যাতন করা নৈতিকতার চর্চা নয়।

পরকীয়া বা দাম্পত্য সম্পর্ক নিয়ে সমাজে মতভেদ থাকতে পারে। ধর্মীয়, নৈতিক ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু এসব মতভেদ কখনোই সহিংসতার বৈধতা তৈরি করে না। একজন মানুষের ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে আপত্তি থাকলেও তাঁর প্রতি মানবিক আচরণ, আইনি সুরক্ষা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

ঝিনাইদহের ঘটনাটি তাই কেবল একটি গ্রামের বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মনে করিয়ে দেয়, সমাজে নৈতিকতার নামে ক্ষমতা প্রয়োগের প্রবণতা কতটা ভয়াবহ হতে পারে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের আগেই কাউকে অপমান করা এবং শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা ন্যায়বিচারের ধারণাকেই দুর্বল করে।

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় কে কত কঠোরভাবে অন্যের বিচার করতে পারে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় সে কতটা ন্যায়সংগতভাবে আইন মেনে চলে। ব্যক্তিগত ক্ষোভের জায়গায় আইনের শাসন, প্রতিশোধের জায়গায় বিচার এবং অপমানের জায়গায় মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করাই এখন জরুরি। অন্যথায় নৈতিকতার নামে নির্যাতন চলতেই থাকবে, আর আইনের শাসন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments