আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে নতুন করে আলোচনায় এসেছে ষোড়শ শতকের ফরাসি ভবিষ্যদ্বক্তা নস্ত্রাদামুসের কথিত ভবিষ্যদ্বাণী। এসব ভবিষ্যদ্বাণীর নিজস্ব ব্যাখ্যা দিয়ে আলোচনায় এসেছেন জন হগ, যিনি ‘আমেরিকার নস্ত্রাদামুস’ নামে পরিচিত। তাঁর দাবি, ২০২৮ সালের মধ্যে একাধিক পারমাণবিক হামলা, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক বিপর্যয় এবং দীর্ঘস্থায়ী বৈশ্বিক যুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তবে তাঁর এসব আশঙ্কার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নস্ত্রাদামুসের বিভিন্ন লেখা ও কথিত ভবিষ্যদ্বাণী বিশ্লেষণ করে জন হগ আন্তর্জাতিক রাজনীতি, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং পশ্চিমা শক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিজের ধারণা তুলে ধরেছেন। তাঁর বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাত, সৌদি আরবকে ঘিরে একটি রহস্যময় ব্যাখ্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা।
জন হগের মতে, ইরানকে কেন্দ্র করে সামরিক সংঘাত তীব্র হলে তা প্রচলিত অস্ত্রের ব্যবহারের সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাঁর আশঙ্কা, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রচলিত অস্ত্রের মজুত কমে গেলে কৌশলগত ও আন্তমহাদেশীয় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ইরানের ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে সম্ভাব্য সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। তাঁর ধারণা, এসব স্থাপনায় হামলা হলে পাল্টা আক্রমণের ধারাবাহিকতায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
হগ আরও আশঙ্কা করেছেন, আরব সাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র এবং উত্তর কোরিয়ার ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন নৌবাহিনীর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটতে পারে বলে তিনি দাবি করেছেন।
তবে এসব সম্ভাবনাকে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঘটতে যাওয়া ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার মতো যাচাইযোগ্য তথ্য নেই। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা করা আর বাস্তবে এমন হামলা ঘটবে বলে নিশ্চিত পূর্বাভাস দেওয়া এক বিষয় নয়।
নস্ত্রাদামুসের কথিত ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাখ্যায় জন হগ ‘মাবুস’ নামের এক রহস্যময় ব্যক্তির প্রসঙ্গ এনেছেন। তাঁর দাবি, ওই ব্যক্তির মৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘস্থায়ী এক যুদ্ধ শুরু হতে পারে, যা ২৭ বছর পর্যন্ত চলবে।
হগের ব্যাখ্যায়, ‘মাবুস’ নামটি সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নামের আদ্যক্ষর ‘এমবিএস’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। এ সূত্র ধরে তিনি সৌদি যুবরাজকে ঘিরে আকস্মিক মৃত্যু, ক্ষমতার পরিবর্তন কিংবা বিমান বিস্ফোরণের মতো সম্ভাব্য ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন।
তবে এই ব্যাখ্যার পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি। ‘মাবুস’ বলতে মোহাম্মদ বিন সালমানকে বোঝানো হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তও প্রতিষ্ঠিত নয়। এটি সম্পূর্ণভাবে হগের নিজস্ব ব্যাখ্যা, যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।
তাঁর আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে অঞ্চলটির তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও হিলিয়াম উৎপাদন এবং সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা, সরবরাহ সংকট এবং খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের পাশাপাশি ইউরোপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জন হগ। তাঁর মতে, ইউক্রেন যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়লে রাশিয়া ও ন্যাটোর মধ্যে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে।
তিনি আশঙ্কা করেছেন, রাশিয়া ইউরোপের অস্ত্র উৎপাদনকেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে পারে। এর জবাবে সামরিক পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়া হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে এবং পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
হগের ব্যাখ্যায়, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের সংঘাত পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। তবে ২৭ বছরব্যাপী বিশ্বযুদ্ধের দাবি তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীর অংশ; এর পক্ষে কোনো প্রতিষ্ঠিত সামরিক বিশ্লেষণ বা বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাসের ভিত্তি নেই।
জন হগের আলোচিত পূর্বাভাসের আরেকটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বকে ঘিরে। তাঁর দাবি, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিশেষ সংকটপূর্ণ হতে পারে।
এই সময়কে তিনি ‘শোফার সাইলেন্স’ নামে একটি ২৪ মাসের জ্যোতিষচক্রের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। তাঁর মতে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, ডিজেলের সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজনৈতিক বিভাজন এবং জাতীয় ঋণের বোঝা যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
হগের ধারণা, এসব সংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা যুক্ত হলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবও কমে যেতে পারে। এমনকি ২০২৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরকে তিনি দেশটির বৈশ্বিক আধিপত্যের পতনের একটি প্রতীকী সময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় উৎপাদন, কর্মসংস্থান, মুদ্রানীতি, সরকারি ঋণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তসহ বহু বাস্তব উপাদানের মাধ্যমে। জ্যোতিষচক্র বা ঐতিহাসিক ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাখ্যা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ে দেশটির অর্থনৈতিক পতন নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
জন হগ বলেছেন, তাঁর উদ্দেশ্য মানুষকে আতঙ্কিত করা নয়; বরং সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করা এবং সংঘাতের পরিবর্তে শান্তির পথ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানানো।
তবে নস্ত্রাদামুসের লেখা নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা ব্যাখ্যা, বিতর্ক ও দাবি প্রচলিত রয়েছে। তাঁর অনেক বক্তব্যের ভাষা রূপকধর্মী ও অস্পষ্ট হওয়ায় পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি সেগুলোকে সমসাময়িক ঘটনা বা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।
জন হগের বক্তব্যও সেই ধারার অংশ। তাঁর পূর্বাভাসে পারমাণবিক হামলা, ২৭ বছরের যুদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পতনের মতো গুরুতর আশঙ্কা উঠে এলেও এগুলোকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বা নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাস্তব উদ্বেগের বিষয়। তবে এসব ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য, অর্থনৈতিক সূচক, সামরিক বিশ্লেষণ ও যাচাইযোগ্য গবেষণার ওপর নির্ভর করাই যুক্তিসংগত। ভবিষ্যদ্বাণীকে বাস্তবতার বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করলে অযথা আতঙ্ক ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়তে পারে।



