Homeঅর্থনীতিই-বর্জ্যে বাড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

ই-বর্জ্যে বাড়ছে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি

তানভীর রায়হান

দেশে দ্রুত বাড়ছে ইলেকট্রনিক বর্জ্য (ই-বর্জ্য)। কিন্তু ক্রমবর্ধমান এই বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন, পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার জন্য এখনো কার্যকর পৃথক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে পুরোনো মুঠোফোন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, এয়ারকন্ডিশনারসহ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রের বড় অংশ সাধারণ গৃহস্থালি বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। পরে এসব বর্জ্য ভাগাড়ে ফেলা, খোলা জায়গায় ভাঙা বা পোড়ানোর কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি বাড়ছে শ্রমিক ও আশপাশের মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-বর্জ্যে থাকা ভারী ধাতু ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান মাটি, পানি ও বায়ু দূষিত করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিতভাবে এসব বর্জ্য ভাঙা, পোড়ানো কিংবা অ্যাসিড ব্যবহার করে ধাতু আলাদা করার সময় ক্ষতিকর উপাদান পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। দীর্ঘদিন এ ধরনের দূষণের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসতন্ত্র, কিডনি, লিভার ও স্নায়ুতন্ত্রসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০১৮ সালের এক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এ বর্জ্যের পরিমাণ প্রতিবছর প্রায় ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। ওই হিসাব অনুযায়ী, ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে বছরে ই-বর্জ্যের পরিমাণ ৪৬ লাখ টনের বেশি হতে পারে। একই সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, উৎপাদিত ই-বর্জ্যের মাত্র প্রায় ৩ শতাংশ পুনঃপ্রক্রিয়াজাত হয়।

ই-বর্জ্যের মধ্যে থাকা সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ, দস্তা, ক্রোমিয়াম, টিনসহ বিভিন্ন উপাদান পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পুরোনো যন্ত্রপাতি খোলা জায়গায় ভাঙা বা পোড়ানোর সময় এসব উপাদান মাটি, পানি ও বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে অনিরাপদভাবে ধাতু পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় কর্মরত শ্রমিকরা সরাসরি এসব দূষকের সংস্পর্শে আসতে পারেন।

রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মুশতাক হোসেন ই-বর্জ্যের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আগে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছিলেন, গৃহস্থালি বর্জ্যের তুলনায় ই-বর্জ্যের ক্ষতির মাত্রা বেশি এবং এর প্রধান ঝুঁকিতে রয়েছে গর্ভবতী নারী ও শিশুরা।

ই-বর্জ্যের সমস্যা শুধু পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান সম্পদের অপচয়। পুরোনো ইলেকট্রনিক যন্ত্রে থাকা বিভিন্ন ধাতু ও অন্যান্য উপাদান সঠিকভাবে পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করা গেলে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। ফলে ই-বর্জ্যকে শুধু পরিত্যক্ত বস্তু হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য সম্পদ হিসেবেও ব্যবস্থাপনার সুযোগ রয়েছে।

এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারির বর্জ্য। গত এক দশকে দেশে সোলার হোম সিস্টেম, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারিচালিত বিদ্যুৎ সংরক্ষণ ব্যবস্থার ব্যবহার বেড়েছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক যানবাহন ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যবহার বাড়ায় লিথিয়াম-আয়ন ও লেড-অ্যাসিড ব্যাটারির বর্জ্যও ভবিষ্যতে ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্রিশ্চিয়ান কমিশন ফর ডেভেলপমেন্ট ইন বাংলাদেশের (সিসিডিবি) ক্লাইমেট সেন্টারের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে স্থাপিত সোলার পিভি সেল থেকে ভবিষ্যতে প্রায় ৩৩ হাজার ২০৫ টন ই-বর্জ্য তৈরি হতে পারে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলে এসব বর্জ্য থেকে প্রায় ২৪ হাজার ৪৬৮ টন কাচ, ২ হাজার ৬৫৬ টন অ্যালুমিনিয়াম, ১ হাজার ৪০৪ টন সিলিকন এবং প্রায় ৫০ টন তামা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

তবে কার্যকর রিসাইক্লিং ব্যবস্থা না থাকায় এসব মূল্যবান উপাদানের একটি বড় অংশ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। পুরোনো ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশও অনেক ক্ষেত্রে অনিরাপদ উপায়ে ভাঙা বা প্রক্রিয়াজাত করা হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি মাটি, পানি ও বায়ু দূষণের আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দেশে উৎপাদিত ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ই-বর্জ্যের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণাটিতে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জও চিহ্নিত করা হয়। একই সঙ্গে এ খাতে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পরিবর্তে প্রশিক্ষণ, নিবন্ধন ও নিরাপদ প্রযুক্তির আওতায় আনা প্রয়োজন। কারণ, এই খাতের কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে পুরোনো ইলেকট্রনিক পণ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের সঙ্গে যুক্ত। তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকি কমবে, অন্যদিকে ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান উপাদান পুনরুদ্ধারের সুযোগ বাড়বে।

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা ও উদ্যোগে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন, জনসচেতনতা বাড়ানো, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর দুর্বলতা দূর করা এবং সিটি করপোরেশন এলাকায় পৃথক ই-বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র স্থাপনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমডোর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, ‘সত্যি বলতে আমাদের ই-বর্জ্য আলাদাভাবে ব্যবস্থাপনা হয় না। সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে আমরা এটি ম্যানেজ করি।’

তিনি জানান, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কোরিয়ান কোম্পানির সঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশন রিসোর্স রিকভারি সেন্টার স্থাপনের চুক্তি করেছে। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পে এমআরএফ (ম্যাটেরিয়াল রিকভারি ফ্যাসিলিটি) প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্য পৃথক করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, প্রকল্পের আওতায় প্লাস্টিক থেকে তেল, জৈব বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার এবং বায়োগ্যাস তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘এই মাস থেকে কনস্ট্রাকশন কাজ শুরু হবে,’ বলেও জানান তিনি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে ই-বর্জ্য মিশে গেলে এর ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ দুটিই কঠিন হয়ে পড়ে। তাই উৎস পর্যায়েই ই-বর্জ্য আলাদা করা, নির্দিষ্ট সংগ্রহকেন্দ্র স্থাপন এবং অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে উৎপাদক ও আমদানিকারকদেরও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে পুরোনো পণ্য ফেরত নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। এতে ব্যবহারের মেয়াদ শেষ হওয়া পণ্য সরাসরি ভাগাড়ে না গিয়ে নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা চেইনে ফেরত আসতে পারে।

সিটি করপোরেশন পর্যায়ে পৃথক সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা, নিয়মিত নজরদারি এবং বিদ্যমান বিধিমালার কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে ক্রমবর্ধমান ই-বর্জ্য ভবিষ্যতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের সুযোগ কাজে লাগানো না হলে বিপুল পরিমাণ মূল্যবান ধাতু ও অন্যান্য সম্পদও হারিয়ে যাবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments