তানভীর রায়হান:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠনের পর প্রায় দুই বছরে সাতটি মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। এসব রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে ২৩ জনকে। যাবজ্জীবন ও বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডসহ মোট ৬৮ জনকে দণ্ডিত করা হলেও এখন পর্যন্ত একটি মৃত্যুদণ্ডও কার্যকর হয়নি। বরং দণ্ডিতদের ৪৭ জনই এখনও পলাতক।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৩ জনের মধ্যে মাত্র চারজনকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। অন্যদিকে কয়েকটি মামলার বিরুদ্ধে আপিলের সুযোগ রয়েছে এবং কিছু মামলা ইতোমধ্যে উচ্চতর আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ফলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে একের পর এক সর্বোচ্চ সাজা ঘোষণা হলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন এখনো শূন্যের ঘরেই রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর রায় বাস্তবায়নে কোথায় তৈরি হচ্ছে প্রধান জট? আসামিদের পলাতক থাকা, আপিল নিষ্পত্তি এবং নির্বাহী পর্যায়ের আনুষ্ঠানিকতা, সব মিলিয়ে রায় কার্যকর করতে দীর্ঘ সময় লাগছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২-এ জুলাই-আগস্টের মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগের বিচার শুরু হয়।
এখন পর্যন্ত ঘোষিত সাতটি রায়ে ৬৮ জন দণ্ডিত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৩ জন মৃত্যুদণ্ড, ১১ জন যাবজ্জীবন এবং ৩৩ জন বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড পেয়েছেন। একজনের হাজতবাসকে সাজা হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং রাজসাক্ষী হওয়ায় একজনকে ক্ষমা করা হয়েছে।
রায়গুলোর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ডের মামলাটি অন্যতম আলোচিত। একই মামলায় সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
চানখাঁরপুলের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ তিন পুলিশ কর্মকর্তার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলামসহ ছয়জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় তৎকালীন এএসআই আমির হোসেন ও কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়ের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। রামপুরার মামলায় তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ সাজা।
কুষ্টিয়ার হত্যাযজ্ঞের মামলায় সাবেক তথ্যমন্ত্রী ও জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর সর্বশেষ ১৫ সেপ্টেম্বর সাবেক সেতুমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাতজনকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
ট্রাইব্যুনালের রায় বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হয়ে দাঁড়িয়েছে আসামিদের পলাতক থাকা। দণ্ডিত ৬৮ জনের মধ্যে ৪৭ জনই এখনও পুলিশের নাগালের বাইরে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২৩ জনের মাত্র চারজন গ্রেপ্তার হওয়ায় বাস্তবায়নের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশে অবস্থানরত আসামিদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সরাসরি গ্রেপ্তারের সুযোগ নেই। তাদের দেশে ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক যোগাযোগ, ইন্টারপোলের সহায়তা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, ট্রাইব্যুনালের পরোয়ানায় অনেক আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে বিদেশে পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের দেশে ফেরাতে ইন্টারপোল ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
রায় কার্যকর না হওয়ার বিষয়ে প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যা, ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব বিচার সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা পর্যন্ত। কোনো পক্ষ আপিল করলে সেটি নিষ্পত্তির এখতিয়ার সর্বোচ্চ আদালতের। চূড়ান্ত রায় বাস্তবায়নের দায়িত্ব নির্বাহী বিভাগের।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তির বিধান থাকলেও বাস্তবে মামলার চাপসহ বিভিন্ন কারণে সব ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা নিষ্পত্তি হচ্ছে না।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিমের ভাষ্য, আগের ট্রাইব্যুনালের ক্ষেত্রেও শতভাগ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি। তখন ১৯৭ জন দণ্ডিত হলেও ছয়জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল। আপিল বিভাগে মামলা দীর্ঘদিন বিচারাধীন থাকা রায় বাস্তবায়নে বিলম্বের অন্যতম কারণ বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার মতে, বর্তমান ট্রাইব্যুনালে অপরাধের ধরন, ব্যক্তির ভূমিকা ও সম্পৃক্ততার মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে সাজা দেওয়া হচ্ছে। ফলে শুধু ট্রাইব্যুনালে মামলা হলেই মৃত্যুদণ্ড—এমন প্রবণতা থেকে বর্তমান বিচারপ্রক্রিয়া বেরিয়ে এসেছে।
১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। ওই ট্রাইব্যুনালে ৫৬টি মামলার রায়ে ১৯৫ জন বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিত হন। খালাস পান দুজন।
প্রথম রায় আসে ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি। পরে আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও মীর কাশেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
অর্থাৎ আগের ট্রাইব্যুনালে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে সময় লাগলেও শেষ পর্যন্ত ছয়টি ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল। বিপরীতে বর্তমান ট্রাইব্যুনাল প্রায় দুই বছরে ২৩টি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে একটিও নয়।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৬০০ অভিযোগ জমা রয়েছে। ৭০টির বেশি মামলা বিচারাধীন। এর অনেকগুলো সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ফলে সামনে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক চাপ আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ অবস্থায় শুধু নতুন মামলার বিচার শেষ করাই নয়, ঘোষিত রায়ের পরবর্তী ধাপ দ্রুত সম্পন্ন করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনা, আপিল নিষ্পত্তি এবং চূড়ান্ত রায় বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় না হলে রায়ের সংখ্যা বাড়লেও কার্যকর বিচারের প্রশ্ন থেকেই যাবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ দ্রুত বিচার ও ঘোষিত রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্য, পলাতক আসামিদের ফিরিয়ে এনে এবং ঘোষিত রায় কার্যকর করে বিচারপ্রত্যাশী পরিবারগুলোর প্রত্যাশা পূরণ করা প্রয়োজন।
তবে আইনি বাস্তবতা হলো, কেবল ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হলেই তা কার্যকর করা যায় না। আপিলের সুযোগ, চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি, আসামির অবস্থান এবং নির্বাহী পর্যায়ের ব্যবস্থা, প্রতিটি ধাপ শেষ হওয়ার পরই রায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন আসে।
ফলে পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনালের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ, বিচারাধীন বিপুলসংখ্যক মামলা দ্রুত ও যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করা এবং ইতোমধ্যে ঘোষিত রায়গুলোর আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে সেগুলো বাস্তবায়নের পথ নিশ্চিত করা।


