Homeশিক্ষাবুয়েটের মেধা এখন প্রান্তিক শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ায়

বুয়েটের মেধা এখন প্রান্তিক শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ায়

নেত্রকোণা প্রতিনিধি:

বুয়েট থেকে পড়াশোনা শেষ করে প্রকৌশলী হয়েছেন। পেয়েছেন ব্যাংকের চাকরির সুযোগ। ৩৪তম বিসিএসেও উত্তীর্ণ হয়েছেন। সামনে ছিল তুলনামূলক আরামদায়ক ও আর্থিকভাবে আকর্ষণীয় ক্যারিয়ারের নানা সম্ভাবনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসবের কোনোটিই ধরে রাখেননি নায়লা শারাফ। বেছে নিয়েছেন এমন একটি পেশা, যাকে অনেকেই উচ্চশিক্ষিতদের জন্য কম আকর্ষণীয় মনে করেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা।

নেত্রকোণা সদরের পঞ্চাননপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত সাত বছর ধরে শিশুদের পড়াচ্ছেন তিনি। তবে তার কাছে শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয়; বরং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সামনে ভালো শিক্ষার সুযোগ তৈরি করার একটি দায়িত্ব।

নায়লা শারাফের বিশ্বাস, শহরের নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিশুদের মতো প্রান্তিক পরিবারের সন্তানদেরও সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তাদের যথাযথভাবে শেখার সুযোগ করে দেওয়া।

নিজের শিক্ষকতার দর্শন ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নায়লা বলেন, ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলে পড়ার সময় তিনি যে শিক্ষা ও সুযোগ পেয়েছেন, দেশের প্রান্তিক শিশুরাও যেন সেই মানের শিক্ষা পাওয়ার সুযোগ পায়, এটাই তার অন্যতম লক্ষ্য।

শিক্ষার্থীদের পাঠ সহজ করতে তাই প্রচলিত বইনির্ভর পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নিজেই ছবি আঁকেন, ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করেন এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠকে শিশুদের উপযোগী করে সাজানোর চেষ্টা করেন। নির্ধারিত কর্মঘণ্টার বাইরেও এসব প্রস্তুতির জন্য স্কুলে সময় দেন তিনি।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লীলা রানী ভৌমিকের চোখেও নায়লার এই উদ্যোগ ব্যতিক্রমী।

তিনি বলেন, নায়লা বিদ্যালয়ের একটি অমূল্য সম্পদ। বুয়েটের মতো প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেও তিনি প্রান্তিক পর্যায়ের শিশুদের নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসা দিয়ে পড়ান। পাঠ সহজ করতে নিজে হাতে ছবি আঁকা ও ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরির পাশাপাশি শিশুদের নৈতিকতা ও সততার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।

নায়লার কাছে শিক্ষাদানের সাফল্য কেবল পরীক্ষার ফলাফলে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চান, তার শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করার পাশাপাশি সত্যবাদী, সাহসী ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠুক।

শিক্ষার্থীদের তিনি বোঝান, কোনো কাজ করার আগে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করতে হবে। এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা অন্যের সামনে বলতে বা স্বীকার করতে লজ্জা লাগে।

প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতার এই পথ বেছে নেওয়ার পেছনে আর্থিক লাভের হিসাব কাজ করেনি বলেই জানান নায়লা।

তার ভাষায়, জীবনে অনেক অর্থ বা বড় পদ পাওয়ার চেয়ে স্বাভাবিক ও নিশ্চিন্ত জীবন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছোট ছোট ভালোবাসার প্রকাশও তাকে আনন্দ দেয়।

আর সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় উৎস তার শিক্ষার্থীরা।

নায়লা বলেন, অন্য কোনো চাকরি করলে হয়তো অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারতেন এবং মানুষ তার মেধার প্রশংসা করত। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে তিনি শিশুদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পান, সেটিকে নিজের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে করেন।

তবে তার এই সিদ্ধান্ত সবাই সহজভাবে গ্রহণ করেনি। বুয়েটের ডিগ্রি নিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করায় আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের অনেকের কাছ থেকেই নানা মন্তব্য শুনতে হয়েছে তাকে। কেউ কেউ তাকে ‘পাগল’ও বলেছেন।

কিন্তু এসব মন্তব্যকে গুরুত্ব দেননি নায়লা। তার কাছে নিজের কাজের মূল্যায়নের মাপকাঠি অন্যদের মতামত নয়; বরং তিনি যে শিশুদের পড়াচ্ছেন, তাদের ভবিষ্যতে তার কাজ কতটা প্রভাব ফেলছে সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

নায়লার এই অবস্থান মূলত প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও একটি প্রশ্ন সামনে আনে। উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় একটি অংশ যেখানে প্রকৌশল, প্রশাসন, ব্যাংকিং কিংবা করপোরেট পেশাকে ক্যারিয়ারের প্রধান গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করেন, সেখানে নায়লার মতো কেউ প্রাথমিক শিক্ষাকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেওয়াকে আলাদা বার্তা হিসেবেই দেখছেন।

নায়লার মতে, প্রাথমিক শিক্ষায় দক্ষ ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি। তরুণ প্রজন্মের প্রতি তার আহ্বান—শুধু ব্যক্তিগত প্রতিদানের হিসাব না করে যদি কেউ শিশুদের জন্য কাজ করার মানসিকতা নিয়ে এই পেশায় আসতে পারেন, তাহলে প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

তিনি মনে করেন, শিক্ষকদের কাজের মান ও নিষ্ঠা বাড়লে রাষ্ট্রের কাছেও এই পেশার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হবে এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হবে।

বুয়েটের ডিগ্রি, প্রকৌশলী হওয়ার সুযোগ কিংবা বিসিএস উত্তীর্ণ হওয়ার পরিচয়ের চেয়েও এখন নায়লার কাছে বড় পরিচয়—তিনি একজন শিক্ষক। প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে বসে যেসব শিশুকে পড়ান, তাদের মধ্যেই তিনি নিজের কাজের ভবিষ্যৎ দেখতে পান।

তার স্বপ্ন খুব বড় কিছু নয়। তিনি চান, তার পড়ানো শিশুরা বড় হয়ে ভালো মানুষ হোক, নিজেদের পরিবার ও সমাজের জন্য কিছু করুক। আর একদিন তিনি না থাকলেও সেই শিক্ষার্থীদের কেউ যদি তাকে মনে করে প্রার্থনা করে—তার কাছে সেটিই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments