রায়হান খান:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। ৬৮টি আসনে জয় এবং সংরক্ষিত নারী আসন পাওয়ার পর সংসদ ও রাজপথে দলটির দৃশ্যমানতা বেড়েছে। একই সময়ে দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য ও নেতাকর্মীকে ঘিরে ওঠা নানা অভিযোগ ও বিতর্ক তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
দলের সমালোচকদের পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক কঠোরতার যে ভাবমূর্তি জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে তুলে ধরেছে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তার সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি করেছে। বিশেষ করে সংসদ সদস্যদের ব্যক্তিগত আচরণ, সরকারি অনুদান ও ত্রাণের বরাদ্দ এবং দলীয় নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ড নিয়ে ওঠা অভিযোগ সামাজিক ও রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।
তবে এসব ঘটনায় দলটি নীরব থাকেনি। অভিযোগ ওঠার পর কয়েকজন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দলের নীতিনির্ধারকদের দাবি, বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির কর্মকাণ্ড দিয়ে পুরো সংগঠনের অবস্থান মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। বরং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার মধ্য দিয়ে দলটি তার সাংগঠনিক অবস্থান ও নৈতিকতার প্রশ্নে কঠোর অবস্থানই দেখিয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে একটি ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়ে বিতর্কের পর বিষয়টি জামায়াতের অভ্যন্তরীণ তদন্তে যায়। পরে দলীয় তদন্তে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে জানিয়ে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে তার সদস্যপদ বাতিলের উদ্যোগ হিসেবে জাতীয় সংসদের স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়া হয়।
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সরকারি অনুদান, ত্রাণ বা বিভিন্ন সহায়তা বিতরণে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ সামনে আসে।
নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিলের অনুদানপ্রাপ্তদের তালিকায় নিজের মেয়ের নামে দুই দফায় ১০ হাজার টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। একই সঙ্গে তার নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ি এলাকার মানুষের আধিক্য নিয়েও আলোচনা হয়। সংসদ সদস্যের দাবি, তার প্যাডে করা অগ্রিম স্বাক্ষর ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সহকারী তালিকা তৈরি করেছিলেন। পরে তিনি ওই সহকারীকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন।
রংপুরের পীরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল আমীনের বিরুদ্ধে টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে আত্মীয়স্বজনকে সভাপতি করার অভিযোগ ওঠে। খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদের বিরুদ্ধেও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ বিতরণে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ সামনে আসে।
এসব ঘটনার পর জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সংসদ সদস্যদের সরকারি অনুদান, ত্রাণ ও আর্থিক সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে সতর্ক করে নির্দেশনা দেয়। পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী বা তাদের স্বজনদের জন্য সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশনাও দেওয়া হয় বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য ও ইসলামি বক্তা মুফতি আমির হামজার কয়েকটি বক্তব্যও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। কুষ্টিয়ায় একটি বক্তব্যে নারী সংসদ সদস্যদের নিয়ে তার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এ নিয়ে মামলা হওয়ার কথাও সামনে আসে।
এ ছাড়া আরেক বক্তব্যে একজন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ মন্তব্য করার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ও সমনের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এর আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও তার একটি বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে ওই বক্তব্যের তথ্যগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং আইনি নোটিশ দেওয়ার কথাও প্রকাশ্যে আসে।
সংসদ সদস্যদের বাইরে দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের নিয়েও কয়েকটি ঘটনা সামনে এসেছে।
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে সরকারি বরাদ্দের একটি বাইসাইকেল প্রকৃত উপকারভোগীর পরিবর্তে এক নেতার নাতনিকে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে বাইসাইকেলটি ফেরত দিয়ে প্রকৃত উপকারভোগীকে দেওয়া হয় এবং সংশ্লিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে সার মজুতের অভিযোগে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ১৮ বস্তা ইউরিয়া সার উদ্ধারের পর এক জামায়াত নেতাকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। পরে দলীয় আদর্শবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়ার কথা জানিয়ে তার সদস্যপদ বাতিল করা হয়।
এ ছাড়া রাজধানীর ধানমন্ডিতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কয়েকজন নেতাকর্মীকে বহিষ্কার এবং মুন্সীগঞ্জে নৈতিক স্খলন ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে দুই সদস্যের সদস্যপদ বাতিলের কথাও জানিয়েছে দলটি।
সাম্প্রতিক সময়ে বিমানবন্দরের একটি ঘটনা জামায়াতকে আবারও রাজনৈতিক আলোচনায় এনেছে। যাত্রী হয়রানি ও বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রতিবাদ করতে গিয়ে মেজর (অব.) আক্তারুজ্জামানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আচরণ ও বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হয়। পরে তার বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেফতার ও রিমান্ডের ঘটনাও ঘটে।
তবে জামায়াত তার পাশে অবস্থান নিয়েছে। দলটির নেতারা বিমানবন্দরের অব্যবস্থাপনা ও যাত্রী হয়রানির বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন। সমালোচকদের কেউ কেউ আবার প্রতিবাদের উদ্দেশ্যের পাশাপাশি তার ভাষা ও আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।
ফলে ঘটনাটি শুধু একজন নেতার আচরণ নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং জামায়াত কেন তাকে সমর্থন করছে, তা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা দলের নৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থানকে সংজ্ঞায়িত করে না। তার মতে, মানুষের সংগঠনে ব্যক্তি পর্যায়ে ভুলত্রুটি হতে পারে; তবে অভিযোগ ওঠার পর দল ব্যবস্থা নিচ্ছে।
দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুমও বলেছেন, কোনো নেতাকর্মী অন্যায় বা অনৈতিক কাজে জড়িত হলে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্বজনপ্রীতির অভিযোগ ওঠার পর সংসদ সদস্যদের সতর্ক করা এবং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়নেও দুই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। এক পক্ষ মনে করছে, জামায়াতের ঘোষিত নৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা সাংঘর্ষিক হওয়ায় দলের ভাবমূর্তিতে চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে অভিযোগের পর দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়াকে দলের জবাবদিহির প্রমাণ হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ।
সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, জামায়াত যে ধরনের নীতি-নৈতিকতার কথা বলে, সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে দলটির ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরীও মনে করেন, কিছু ঘটনা দলটিকে অস্বস্তিতে ফেললেও অভিযোগের পর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আব্দুল লতিফ মাসুমের মতে, একজন ব্যক্তি ভুল করতে পারেন, কিন্তু জামায়াতের কাছ থেকে মানুষ তুলনামূলকভাবে বেশি নৈতিকতা প্রত্যাশা করে। ফলে ব্যক্তির কর্মকাণ্ডও দলটির সামগ্রিক ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো জামায়াতের সামনে দুটি সমান্তরাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে—একদিকে ব্যক্তিগত ও স্থানীয় পর্যায়ের বিতর্ক নিয়ন্ত্রণ, অন্যদিকে দ্রুত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের ঘোষিত নৈতিক অবস্থানকে বাস্তবে কতটা কার্যকর রাখা যায়, তা প্রমাণ করা।
নির্বাচনের পর জাতীয় রাজনীতিতে দলটির প্রভাব ও দায়িত্ব দুটিই বেড়েছে। ফলে ভবিষ্যতে দলীয় নেতাকর্মীদের আচরণ, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি এবং অভিযোগের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়াই জামায়াতের ভাবমূর্তি নিয়ে জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।


