নিজস্ব প্রতিনিধি:
রাজধানীর মিরপুরে পোশাককর্মী সায়মনকে ছিনতাইয়ের পর হত্যার মামলায় তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই মামলায় চোরাই মোবাইল নিজের কাছে রাখার দায়ে অপর এক আসামিকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) ঢাকার ১৩তম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জাহিদুল ইসলামের আদালত এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন মো. ইউসুফ, ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসান। তাঁদের প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। অপর আসামি সুজন পলাতক থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে তিন বছরের কারাদণ্ডের পাশাপাশি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।
আদালতের বেঞ্চ সহকারী সোহেল মিয়া রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মামলায় কারাগারে থাকা ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানকে রায় ঘোষণার আগে আদালতে হাজির করা হয়। রায় শেষে তাঁদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারি করে কারাগারে পাঠানো হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অ্যাডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর আবুল কালাম আজাদ জানান, সুজন মামলার শুরু থেকেই পলাতক। তাঁর বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানার পাশাপাশি গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, নিহত সায়মন মিরপুর-১ এলাকার লিবার্টি গার্মেন্টসে কর্মরত ছিলেন। তাঁর মাসিক বেতন ছিল ১০ হাজার টাকা।
২০২২ সালের ১১ অক্টোবর অফিস থেকে বেতন নেওয়ার পর দুই সহকর্মী রিফাত হোসেন রাব্বি ও হৃদয় হাসানের সঙ্গে মিরপুর-১ এলাকায় কেনাকাটা করতে যান সায়মন। রাত ৯টার দিকে কেনাকাটা শেষে তাঁরা বাসার উদ্দেশে রওনা হন।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, আড়ং শপিং সেন্টারের সামনে কয়েকজন ব্যক্তি সায়মন ও তাঁর সহকর্মীদের পথরোধ করেন। তাঁদের একজন সায়মনকে তাঁর ছোট ভাইকে মারধরের অভিযোগ তুলে ভয় দেখান এবং কথা বলার কথা বলে তাঁদের সঙ্গে যেতে বাধ্য করেন।
পরে রিকশায় করে তাঁদের দারুস সালাম থানার কোনাবাড়ি হয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এলাকার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায়ে রিফাতকে কাঁচাবাজারের সামনে নামিয়ে দিয়ে সায়মনকে স্মৃতিসৌধের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে মামলার নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
সেখানে তিন ব্যক্তি ছুরি দেখিয়ে সায়মনের কাছে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন দিতে বলেন। তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে ছুরিকাঘাত করে আহত করা হয় বলে অভিযোগে বলা হয়। পরে তাঁর কাছ থেকে টাকা ও মোবাইল ফোন নিয়ে অভিযুক্তরা চলে যায়।
সায়মনের চিৎকার শুনে স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর নিহতের বাবা শাজাহান শেখ দারুস সালাম থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
তদন্তে নেমে পুলিশ ইউসুফকে গ্রেফতার করে। মামলার নথি অনুযায়ী, পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইকবাল ও মেহেদী হাসানের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। সায়মনের কাছ থেকে নেওয়া টাকার একটি অংশ ইউসুফের বাসা থেকে উদ্ধারের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তে আরও উঠে আসে, সায়মনের মোবাইল ফোনটি সুজনের কাছে ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করা হয়েছিল বলে ইউসুফ পুলিশকে জানিয়েছিলেন।
তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি ইউসুফ, ইকবাল ও মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ছিনতাইয়ের পর হত্যার অভিযোগে এবং সুজনের বিরুদ্ধে চোরাই মাল রাখার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় দারুস সালাম থানা পুলিশ।
২০২৩ সালের ২ আগস্ট চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে মামলার বিচার শুরু হয়। বিচার চলাকালে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের ১৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করেন।
পরে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়। উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মঙ্গলবার মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।
রায়ে ইউসুফ, ইকবাল খাঁ ও মেহেদী হাসানকে মৃত্যুদণ্ড এবং প্রত্যেককে ২০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। চোরাই মোবাইল রাখার দায়ে সুজনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে এ সাজা ঘোষণা করা হয় এবং গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।


