Homeবিবিধঅপরাধবিচার শেষ না হওয়ায় কারাগারে বাড়ছে বন্দীর চাপ

বিচার শেষ না হওয়ায় কারাগারে বাড়ছে বন্দীর চাপ

৪৫ হাজারের সক্ষমতায় ১ লাখ ৬ হাজার, দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ অতিরিক্ত বন্দী বাংলাদেশে

রায়হান আহমেদ:

দেশের কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর সংখ্যা এখন দ্বিগুণেরও বেশি। ৭৫টি কারাগারে সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার ১৮৬ জন বন্দী রাখার ব্যবস্থা থাকলেও ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সেখানে বন্দীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার। ফলে ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দীর হার প্রায় ২৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে।

কারাগারে অতিরিক্ত বন্দীর এই চাপের পেছনে সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেপ্তার বৃদ্ধি যেমন ভূমিকা রাখছে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়ায় বিচারাধীন বন্দীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়াও বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের (ডব্লিউপিবি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারাগারে ধারণক্ষমতার ২২৬ দশমিক ১ শতাংশ বন্দী রয়েছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ হার সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের পরেই রয়েছে শ্রীলঙ্কা, যেখানে ধারণক্ষমতার ২১৬ শতাংশ বন্দী রয়েছে। পাকিস্তানে এ হার ১৬৩, নেপালে ১৪৪, ভারতে ১১৩ এবং মিয়ানমারে ১১২ শতাংশ।

ডব্লিউপিবির হিসাবে, চলতি সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশের কারাগারে বন্দী ছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন। প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে দেশে কারাবন্দীর সংখ্যা ৫৯ জন। তবে কারা অধিদপ্তরের ২৯ সেপ্টেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, বন্দীর সংখ্যা আরও বেড়ে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

কারা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সাম্প্রতিক সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও গ্রেপ্তার বেড়েছে। মাদক, সাইবার অপরাধ ও কিশোর অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একটি অংশ কারাগারে আসছেন। এতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বন্দীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তবে কারাগারে থাকা ব্যক্তিদের বড় একটি অংশের বিচার এখনো শেষ হয়নি। ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট বন্দীর ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশই বিচারপূর্ব বন্দী। অর্থাৎ কারাগারে থাকা প্রতি তিনজনের প্রায় দুজনের মামলার বিচার শেষ হয়নি।

সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতাকে অতিরিক্ত বন্দীর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, অনেক আদালতে একজন বিচারকের ওপর কয়েক হাজার মামলা রয়েছে। ফলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তিনি বিচারকের সংখ্যা বাড়ানো, আদালতে প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ই-জুডিশিয়ারি, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ও ফৌজদারি মামলায় প্লি বার্গেনিংয়ের মতো ব্যবস্থা চালু হলে আদালতের ওপর চাপ কমতে পারে বলেও মত দেন তিনি।

পরিসংখ্যান বলছে, গত দুই দশকের বেশি সময় ধরেই দেশের কারাগারে বন্দীর সংখ্যা ওঠানামা করেছে। ২০০০ সালে ৬২ হাজার ৬৬৯ জন থেকে ২০০৮ সালে তা বেড়ে ৮৬ হাজার ৮৩৮ জনে দাঁড়ায়। ২০২০ সালে বন্দী ছিলেন ৮৮ হাজার ৮৪ জন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগের দিন প্রায় ৮৮ হাজার বন্দী থাকলেও এক সপ্তাহ পর তা কমে প্রায় ৪৯ হাজারে নেমেছিল। পরে আবার দ্রুত বাড়তে থাকে।

বর্তমানে কারাগারের ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দী থাকায় আবাসন ছাড়াও খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে চাপ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নতুন কারাগার নির্মাণ করে এ সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। কারাগারের অবকাঠামো বাড়ানোর পাশাপাশি বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, জামিন ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ এবং বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়াতে হবে। অন্যথায় কারাগারে বন্দীর চাপ কমানোর বদলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজনই ক্রমাগত বাড়তে থাকবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments