সম্পাদকীয়:
দেশে আবারও এলপিজি সিলিন্ডারের সংকটের খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ওঠানামা এবং সরবরাহব্যবস্থার নানা অনিশ্চয়তার প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে পড়ছে, তখন দেশের বাজারে হঠাৎ করে এলপিজির সরবরাহ কমে যাওয়া ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ কোনোভাবেই হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই।
একটি বিষয় এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, সংকটটি যদি প্রকৃত সরবরাহ ঘাটতির কারণে হয়ে থাকে, তার কারণ দ্রুত চিহ্নিত করা প্রয়োজন। আর যদি পর্যাপ্ত আমদানি ও মজুত থাকার পরও বাজারে সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়ে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া আরও জরুরি। কারণ জ্বালানির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে কৃত্রিম সংকট শুধু ভোক্তার বাড়তি খরচই বাড়ায় না, সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
বিভিন্ন সূত্রে এমন অভিযোগ উঠেছে, চাহিদা অনুযায়ী এলপিজি আমদানি হলেও কিছু অপারেটর তা বাজারে ছাড়ার পরিবর্তে ট্যাংকারে বা অন্যত্র ধরে রাখছেন। এমনকি সরবরাহ সীমিত দেখাতে সমুদ্রে জাহাজ আটকে রাখার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। তবে অভিযোগ যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি নিছক ব্যবসায়িক অনিয়ম নয়; এটি ভোক্তার স্বার্থের ওপর সরাসরি আঘাত।
এখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। দেশের এলপিজি বাজারের বড় অংশ যদি সীমিতসংখ্যক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে বাজার প্রতিযোগিতামূলক রাখা এবং সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি), জ্বালানি বিভাগ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি ছাড়া এ ধরনের সংকট কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা কঠিন।
শুধু বাজারে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে সংকট মোকাবিলা করা যাবে না। এলপিজি আমদানির পরিমাণ, বন্দরে খালাস, মজুত, পরিবহন ও ডিলার পর্যায়ে সরবরাহ—পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত নজরদারির আওতায় আনতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান কত পরিমাণ এলপিজি আমদানি করেছে, তাদের মজুত কত এবং বাজারে কী পরিমাণ সরবরাহ করেছে, এসব তথ্য নিয়মিতভাবে পর্যালোচনা করা হলে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।
দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা জরুরি। আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ও অন্যান্য যৌক্তিক খরচ বিবেচনায় নিয়ে মূল্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে ভোক্তাকে সেই নির্ধারিত দামে পণ্য পাওয়া যাচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, এ প্রশ্নের উত্তরও খুঁজতে হবে। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ থাকলে শুধু খুচরা বিক্রেতাকে দায়ী না করে সরবরাহব্যবস্থার ওপরের স্তরেও নজর দিতে হবে।
একই সঙ্গে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্ব পেতে হবে। এলপিজির সরবরাহব্যবস্থা যদি অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে যেকোনো ধরনের সরবরাহ বিঘ্ন বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তই ভোক্তার জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় নতুন ও সক্ষম ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা এবং সরকারি পর্যায়ে কৌশলগত মজুত ও আমদানি সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে এলপিজি সরবরাহের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবার রান্নার কাজে এলপিজির ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই পণ্যের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু একটি সিলিন্ডারের দামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ বিভিন্ন খাতে এর প্রভাব পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের ব্যয় বাড়ে।
তাই এলপিজি সংকটকে সাময়িক বাজার সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। সংকটের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে। কোথাও মজুতদারি বা বাজার কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে আমদানি থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো সরবরাহব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের দায়িত্ব ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া নয়, বরং ব্যবসার জন্য ন্যায্য পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভোক্তার অধিকার রক্ষা করা। তাই এলপিজি বাজারে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও কার্যকর তদারকি নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। নিত্যপ্রয়োজনীয় জ্বালানি নিয়ে কোনো গোষ্ঠী যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করতে না পারে, সেটিই হতে হবে সরকারের প্রধান লক্ষ্য।


