Homeসারাদেশচট্টগ্রামরোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশুদের হাতেই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, ছড়াচ্ছে সুরক্ষার বার্তা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শিশুদের হাতেই বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, ছড়াচ্ছে সুরক্ষার বার্তা

রায়হান আহমেদ:

কক্সবাজারের জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১২ বছর বয়সী সালেমার (ছদ্মনাম) বিয়ে প্রায় চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু শৈশবেই বিয়ের বন্ধনে জড়াতে চায়নি সে। নিজের উদ্বেগের কথা সহপাঠীদের জানালে পাশে দাঁড়ায় অন্য কিশোরীরা। পরে শিক্ষাকেন্দ্রের শিক্ষিকা ও শিশুসুরক্ষাকর্মীদের সহায়তায় পরিবারের সঙ্গে আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয় বাল্যবিয়ের আয়োজন।

নিজের বিয়ে ঠেকানোর অভিজ্ঞতা সালেমাকে শুধু সাহসই দেয়নি, অন্য শিশুদের সচেতন করার প্রেরণাও জুগিয়েছে। এখন সে সহপাঠী ও প্রতিবেশীদের বাল্যবিয়ের ঝুঁকি, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং বিপদে পড়লে কোথায় সহায়তা চাইতে হবে, তা জানাচ্ছে। তার মতো আরও অনেক শিশু নিজেদের শেখা বিষয় ছড়িয়ে দিয়ে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সুরক্ষা ও সচেতনতার কাজে ভূমিকা রাখছে।

বাস্তুচ্যুতি, আর্থিক সংকট, শিক্ষার সীমিত সুযোগ ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে ওঠা এসব শিশুর উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। কেউ বাল্যবিয়ে ঠেকাতে সহায়তা করছে, কেউ শিক্ষাকেন্দ্র থেকে ঝরে পড়া সহপাঠীদের ফিরিয়ে আনছে, আবার কেউ স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতার বার্তা পৌঁছে দিচ্ছে পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে।

জাতিসংঘের শিশুসুরক্ষা সাব-সেক্টরের তথ্য এবং চাইল্ড প্রটেকশন ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের ড্যাশবোর্ড অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে শনাক্ত শিশুসুরক্ষা ঝুঁকির প্রায় ৮ শতাংশ বাল্যবিয়ে বা এ-সংক্রান্ত ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের প্রায় ৯৯ শতাংশই কিশোরী বা মেয়েশিশু।

যৌথ রেসপন্স প্ল্যান ও এমএসএনএ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বাল্যবিয়ের পেছনে পরিবারের আর্থিক সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোহিঙ্গা তরুণ-তরুণীদের একটি বড় অংশ সামাজিক বাধার কারণে শিক্ষার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে কিশোরী ক্লাব ও শিশু নেতৃত্ব দলগুলো সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের সহায়তা পাওয়ার পথ দেখাচ্ছে। সালেমা জানায়, ১০ বছর বয়স থেকেই তাকে বিয়ের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। কিশোরী ক্লাবে যুক্ত হওয়ার পর বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, নিজের নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনে সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে জানতে পারে সে। পরে নিজের পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলার সাহস পায়।

সালেমার অভিজ্ঞতা, শিশুদের সুরক্ষাবিষয়ক শিক্ষা বাস্তব জীবনে কাজে লাগানোর একটি উদাহরণ। তবে এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে বাল্যবিয়ে কমেছে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও নির্ভরযোগ্য ও তুলনামূলক তথ্য প্রয়োজন।

শামীমা (ছদ্মনাম) ২০১৭ সালে মিয়ানমারের মংডুতে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। সে বছর সহিংস পরিস্থিতির কারণে পরিবারের সঙ্গে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে হয় তাকে। নতুন পরিবেশে এসে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আশপাশের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ নিয়েও চিন্তিত হয়ে পড়ে সে।

শামীমা জানায়, অনেক শিশু তখন পড়াশোনা থেকে দূরে ছিল। বিশেষ করে মেয়েশিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। নিজের মতো অন্য শিশুরাও যাতে পড়ার সুযোগ পায়, সে জন্য ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে তাদের পড়াতে শুরু করে সে। পরে শিক্ষাকেন্দ্র চালু হলে শিশুদের সেখানে যেতে উৎসাহিত করে এবং সম্ভব হলে সঙ্গে নিয়ে যায়।

একসময় যে শিক্ষাকেন্দ্রে শিখতে যেত, এখন সেখানেই অন্য শিশুদের শেখানোর দায়িত্ব পালন করছে শামীমা। তার অভিজ্ঞতা দেখায়, সুযোগ পেলে শিশুরাও নিজেদের কমিউনিটিতে শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউনিসেফ ও অংশীদার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৩২০টির বেশি শিশু নেতৃত্ব দল গঠন করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ২০০ শিশু-কিশোর। তারা পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সচেতনতা নিয়ে কাজ করছে। ছোটদের খেলাধুলা, ছড়া ও গানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যবিধি শেখানোর পাশাপাশি এলাকার পানির কল নষ্ট হওয়া বা অন্যান্য সমস্যার কথাও সংশ্লিষ্টদের জানায় তারা।

শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, ঝুঁকির মুখে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা এবং সহায়তার পথ দেখাতে তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রজেক্ট অফিসার মিঠু প্রভাকর জানান, শিশুদের অভিযোগ জানানোর জন্য হটলাইন ও নিরাপদ অভিযোগ বাক্সের ব্যবস্থা রয়েছে। পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

ব্র্যাকের চাইল্ড প্রটেকশন টিমের ফোকাল পারসন মো. মাজেদুল ইসলাম বলেন, বাল্যবিয়ের আশঙ্কা বা ঘটনা সম্পর্কে শিশুরা তথ্য জানালে সুরক্ষাকর্মীরা পরিবার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেন। প্রয়োজনে কমিউনিটির নেতা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তাও নেওয়া হয়।

শিশুদের উদ্যোগে অভিভাবকদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সংস্থাগুলোর উঠান বৈঠক ও ইতিবাচক অভিভাবকত্ববিষয়ক সেশনে শিশুদের কথা শোনা, তাদের শিক্ষায় উৎসাহ দেওয়া এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

অভিভাবক জামিলা বেগমের মতে, শিশুদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লে বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে আরও অগ্রগতি সম্ভব। তবে সমস্যাটি পুরোপুরি দূর হয়নি। তাই শিশুদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি পরিবারকেও পাশে দাঁড়াতে হবে।

অভিবাসন ও শরণার্থী-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ, স্বাস্থ্য সচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার মতো বিষয়ে শিশুদের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। অর্থায়নের সংকটে কিছু কার্যক্রম ও শিক্ষাকেন্দ্রের পরিসর সীমিত হয়ে পড়লে শিশুদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত রাখার সুযোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ উদ্যোগ টেকসই করতে পরিবার, কমিউনিটি, ক্যাম্প নেতৃত্ব ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত সহযোগিতা প্রয়োজন।

কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয়ের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, রোহিঙ্গা শিশুদের শিক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। শিশুদের কল্যাণে পরিচালিত কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো কাজ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারও সহযোগিতা করছে।

সালেমা, শামীমা ও তাদের মতো শিশুদের উদ্যোগ দেখাচ্ছে, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্যদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব। তবে তাদের ওপর সুরক্ষার দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশ, শিক্ষা এবং নির্ভরযোগ্য সহায়তা নিশ্চিত করাই জরুরি। শিশুদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবার, কমিউনিটি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করতে পারলে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সুরক্ষা ও শিক্ষার সুযোগ আরও বিস্তৃত হতে পারে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments