তানভীর রায়হান:
কেউ ছিনতাই করছে, কেউ চাঁদাবাজি বা হামলায় জড়াচ্ছে, আবার কেউ অস্ত্র হাতে এলাকায় মহড়া দিচ্ছে। এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হচ্ছে কিশোর ও তরুণেরা। কিন্তু তাদের দিয়ে অপরাধ করানোর অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, সেই নেপথ্যের নির্দেশদাতা, অর্থদাতা ও পৃষ্ঠপোষকদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকলে একজন গ্রেফতার হলেও তার জায়গায় নতুন সদস্য আসার সুযোগ থেকে যায়।
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩৮৬টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে রয়েছে ১৫৯টি, যেখানে সদস্যসংখ্যা তিন হাজারের বেশি। গত বছর রাজধানীতে সক্রিয় গ্যাংয়ের সংখ্যা ছিল ১১৮। অর্থাৎ এক বছরে তালিকায় নতুন করে যুক্ত হয়েছে ৪১টি গ্যাং।
কিশোর গ্যাংয়ের অপরাধ এখন শুধু নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ বা এলাকায় আধিপত্য বিস্তারে সীমাবদ্ধ নেই। ছিনতাই, মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, জমি-বাড়ি দখল এবং সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। কোথাও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ব্যক্তি, স্থানীয় প্রভাবশালী কিংবা সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রেজাউল করিমের মতে, এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, আধিপত্য বিস্তার ও অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য লোকবল ব্যবহারের প্রবণতা থেকে কিশোর গ্যাং তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ ক্ষেত্রে অপরাধী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, সমাজে ‘মাসল পাওয়ার’-এর একটি সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় লোকবল প্রয়োজন হয়। সেই লোকবল অনেক সময় কিশোরদের দিয়ে তৈরি করা হয়। এভাবেই অপরাধী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে ওঠে।
অধ্যাপক রেজাউল করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া সাধারণত ধাপে ধাপে এগোয়। প্রথমে মাদক পৌঁছে দেওয়া, তথ্য সরবরাহ, এলাকায় মহড়া দেওয়া কিংবা কাউকে ভয় দেখানোর মতো কাজে যুক্ত করা হয়। পরে অপরাধী চক্রের তত্ত্বাবধানে তাদের আরও গুরুতর অপরাধে সম্পৃক্ত করা হতে পারে।
অর্থ, পরিচিতি, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সান্নিধ্য এবং অস্ত্র প্রদর্শনের সুযোগ কিশোরদের একটি অংশকে অপরাধের দিকে আকৃষ্ট করে বলেও মনে করেন এই অপরাধবিজ্ঞানী। তাঁর আশঙ্কা, সময়মতো প্রতিরোধ করা না গেলে এসব গ্যাংয়ের কিছু সদস্য ভবিষ্যতে আরও সংগঠিত অপরাধী হয়ে উঠতে পারে।
পুলিশের বিভিন্ন তালিকা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কিশোর গ্যাংয়ের পেছনে শতাধিক পৃষ্ঠপোষকের নাম উঠে এসেছে। তাঁদের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, সাবেক জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় প্রভাবশালী, আবাসন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভিত্তিক তদন্ত ও প্রমাণের ভিত্তিতে দায় নির্ধারণ করা জরুরি।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের সমীকরণ বদলালেও কিশোরদের ব্যবহার করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অভিযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কোথাও পুরোনো প্রভাবশালীরা সক্রিয় রয়েছেন, আবার কোথাও নতুন ব্যক্তিদের আশ্রয়ে গ্যাং সদস্যদের তৎপরতার অভিযোগ উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র হাতে দলবদ্ধভাবে চলাচল ও মহড়ার ভিডিও ছড়িয়ে পড়াও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। এসব ভিডিওর মাধ্যমে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং নিজেদের প্রভাব প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা। তবে অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া প্রতিটি ভিডিওর সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) মো. সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, সারা দেশে কিশোর গ্যাং ও তাদের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা ধরে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গনি বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান ও গ্রেফতারের পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করতে উঠান বৈঠক করা হচ্ছে।
সন্তান কোথায় যাচ্ছে এবং কী করছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের নজর রাখার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, পরিবার থেকে সঠিক দিকনির্দেশনা ও সচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে কিশোর অপরাধ কমাতে সহায়তা মিলবে।
তবে অপরাধ বিশ্লেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি অপরাধে জড়িত প্রাপ্তবয়স্ক পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠকদের শনাক্ত করাও জরুরি। কারণ কিশোরদের অপরাধে ব্যবহার করে যারা লাভবান হয়, তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শুধু গ্রেফতার ও অভিযান দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ফল পাওয়া কঠিন।
কিশোর গ্যাং মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান প্রয়োজনীয় হলেও সেটিই একমাত্র সমাধান নয়। অপরাধে ব্যবহৃত অর্থের উৎস, অস্ত্রের সরবরাহ, মাদক কারবারের যোগাযোগ, অপরাধের নির্দেশদাতা এবং পৃষ্ঠপোষকদের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে গ্রেফতার হওয়া কিশোরদের বয়স, অপরাধে ভূমিকা ও পুনর্বাসনের সম্ভাবনা বিবেচনায় নিয়ে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে। বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া, বেকারত্ব, পারিবারিক অবহেলা এবং অপরাধী গোষ্ঠীর প্রলোভনে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা কিশোরদের চিহ্নিত করে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয়ের সম্পর্ক থাকলেও তদন্ত যেন প্রমাণনির্ভর হয়। কোনো ব্যক্তির পরিচয় নয়, অপরাধে তাঁর ভূমিকা ও সংশ্লিষ্টতার প্রমাণই হতে হবে আইনগত ব্যবস্থার ভিত্তি।
কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের গ্রেফতার করে অপরাধের তাৎক্ষণিক ঝুঁকি কমানো সম্ভব। কিন্তু যে নেটওয়ার্ক তাদের অপরাধে যুক্ত করে, অর্থ জোগায় এবং প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, সেটি ভাঙতে না পারলে একই চক্র নতুন সদস্য নিয়ে আবার সক্রিয় হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। তাই অপরাধের দৃশ্যমান মুখের পাশাপাশি নেপথ্যের সংগঠকদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনার সক্ষমতাই হবে এই সংকট মোকাবিলার অন্যতম প্রধান পরীক্ষা।



