তানভীর রায়হান:
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সাধারণত স্থানীয় সমস্যা, নাগরিক সেবা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ভিত্তিতে জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে রাস্তা, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জন্মনিবন্ধন, স্থানীয় অবকাঠামো ও জনসেবার মতো বিষয়গুলোই ভোটারদের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে এসব নির্বাচনও দলীয় রাজনীতি, রাজনৈতিক সমর্থন এবং সাংগঠনিক শক্তির হিসাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রস্তুতি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, আগামী বছরের ২১ জানুয়ারি থেকে ২৭ মে পর্যন্ত পাঁচ ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের প্রক্রিয়া নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থান, আইনি ব্যাখ্যা এবং নির্বাচনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষেত্রও হয়ে উঠছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হলেও প্রার্থীদের রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় সমর্থন ও সাংগঠনিক যোগাযোগ ভোটের মাঠে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া বিএনপির সামনে প্রার্থী বাছাই একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় একই পদে একাধিক নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সক্রিয়তা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়ায় প্রার্থীর সংখ্যা বাড়া অস্বাভাবিক নয়।
তবে একই দলের একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে দলীয় সমর্থন নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ের মতামত ও প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বলে দলটির নেতারা জানিয়েছেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মতামত কতটা গুরুত্ব পাবে এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, তা নির্ভর করবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অংশগ্রহণের ওপর।
রাজনৈতিক দলের সমর্থন কোনো প্রার্থীর পরিচিতি বাড়াতে পারে, কিন্তু সেটিই জনপ্রতিনিধি হওয়ার একমাত্র মানদণ্ড হওয়া উচিত নয়। স্থানীয় সমস্যা সম্পর্কে ধারণা, জনসম্পৃক্ততা, সততা, জবাবদিহির মানসিকতা এবং কাজের পরিকল্পনাও প্রার্থী মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দলীয় সমর্থন নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব বিবেচনা উপেক্ষিত হলে স্থানীয় নির্বাচনের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রার্থী বাছাই ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি চালাচ্ছে। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অনেক এলাকায় সম্ভাব্য প্রার্থী চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে এনসিপি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি করপোরেশন পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা বলেছে।
এই অবস্থানগুলো থেকে বোঝা যায়, জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সম্পর্ক বা সমীকরণ থাকলেও স্থানীয় নির্বাচনে নিজস্ব সাংগঠনিক পরিচয় ও সমর্থন যাচাই করার আগ্রহ রয়েছে। তবে কোনো দলের প্রার্থী ঘোষণা কিংবা সাংগঠনিক প্রস্তুতি নির্বাচনে তার প্রকৃত জনসমর্থনের পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ নয়। জনসমর্থন বোঝার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ, ভোটারদের অংশগ্রহণ, নির্বাচনি প্রচারের সুযোগ এবং ভোট গণনার বিশ্বাসযোগ্যতা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। প্রার্থী মনোনয়নের মতো সমর্থন নির্ধারণের প্রক্রিয়াতেও মতভিন্নতার সুযোগ রাখা, স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা এবং সিদ্ধান্ত নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে তা শান্তিপূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর প্রতি সহনশীলতা বজায় রাখা এবং ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কোন শর্তে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। এ বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভিন্ন বক্তব্য আসার কথা প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একদিকে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় হওয়ায় আইনগত যোগ্যতা পূরণকারী ব্যক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। অন্যদিকে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই বলেও বক্তব্য এসেছে। জামায়াতে ইসলামীও এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে ব্যক্তির আইনগত যোগ্যতা, কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাচনে দলীয় পরিচয়ে অংশগ্রহণের বিধান, এই বিষয়গুলোকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আইনগত অযোগ্যতা থাকলে তা প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হবে। আবার কোনো দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক ব্যক্তির ব্যক্তিগত নির্বাচনি যোগ্যতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একই রকম হবে কি না, সেটিও প্রযোজ্য আইন ও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে স্পষ্ট করা দরকার।
এখানে সরকারের বক্তব্য, নির্বাচন কমিশনের বিধান এবং আদালতের কোনো প্রাসঙ্গিক আদেশ থাকলে তার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। অস্পষ্টতা থাকলে তা প্রার্থী, ভোটার ও নির্বাচনি প্রশাসন, সবার জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব হলো প্রার্থিতার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার মানদণ্ড স্পষ্টভাবে জানানো এবং সব ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সাফল্য শুধু নির্ধারিত সময়ে ভোট আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ভোটাররা নির্বিঘ্নে প্রচার কার্যক্রম দেখতে পারবেন কি না, প্রার্থীরা সমান সুযোগ পাবেন কি না, প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবে কি না এবং ভোটের ফলাফল নিয়ে আস্থা তৈরি হবে কি না, এসব বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত স্থানীয় সমস্যা ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নির্বাচনি আলোচনার কেন্দ্রে রাখা। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের উচিত প্রার্থী বাছাই, আচরণবিধি, নির্বাচনি ব্যয়, প্রচারের সুযোগ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও হতে হবে আইননির্ভর ও নিরপেক্ষ।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নাগরিকের সবচেয়ে কাছের জনপ্রশাসনিক কাঠামো। সেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সিদ্ধান্ত সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলে। তাই এই নির্বাচনকে কেবল দলীয় শক্তি যাচাইয়ের প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, দলীয় সমর্থনও থাকতে পারে; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো ভোটারের স্বাধীনতা, প্রার্থীর জবাবদিহি এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা।
শেষ পর্যন্ত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মূল্যায়ন হওয়া উচিত এই প্রশ্নে, নাগরিকেরা কি স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি বেছে নিতে পেরেছেন, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কি জনগণের কাছে জবাবদিহি করেছেন এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কি মানুষের প্রয়োজন পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে? এই মানদণ্ড নিশ্চিত করা গেলে নির্দলীয় স্থানীয় সরকার নির্বাচন তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে।



