Homeজাতীয়হঠাৎ কেন পিএসসি ছাড়লেন মোবাশ্বের মোনেম, প্রশ্ন সংস্কার ও প্রশাসনিক সম্পর্ক নিয়ে

হঠাৎ কেন পিএসসি ছাড়লেন মোবাশ্বের মোনেম, প্রশ্ন সংস্কার ও প্রশাসনিক সম্পর্ক নিয়ে

পাঁচ বছরের মেয়াদ শুরুর দুই বছরেরও কম সময়ে পদত্যাগ; শারীরিক অসুস্থতার কথা বললেও সামনে এসেছে নানা আলোচনা

তানভীর রায়হান:

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোবাশ্বের মোনেমের আকস্মিক পদত্যাগ ঘিরে প্রশাসনিক ও সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়ার দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মঙ্গলবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি। শারীরিক অসুস্থতাকে পদত্যাগের কারণ হিসেবে উল্লেখ করলেও পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

মোবাশ্বের মোনেম অবশ্য জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত কাজের চাপ, বয়সজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাও ছিল তাঁর। তাঁর ভাষ্য, পদত্যাগের পেছনে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না।

তবে তাঁর পদত্যাগের সময় ও প্রেক্ষাপট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর পিএসসির দীর্ঘদিনের নিয়োগজট কমানো, বিসিএস পরীক্ষার সময়সীমা সংকুচিত করা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়াতে একাধিক সংস্কার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন কতটা এগিয়েছে এবং তাঁর বিদায়ের সঙ্গে সংস্কার কার্যক্রমের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপের অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি।

মোবাশ্বের মোনেমের নেতৃত্বাধীন কমিশনের অন্যতম আলোচিত উদ্যোগ ছিল ‘ওয়ান বিসিএস, ওয়ান ইয়ার’ পরিকল্পনা। এর লক্ষ্য ছিল একটি বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ থেকে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া ১২ মাসের মধ্যে শেষ করা।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর নেতৃত্বাধীন কমিশনের সময়ে ৪৪তম, ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৮তম ও ৪৯তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করা হয়েছে। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে মোট ৭ হাজার ৬৫১ জনকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি ৪৭তম ও ৫০তম বিসিএস দ্রুত সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ৫০তম বিসিএসের ক্ষেত্রে এক বছরের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়।

বিসিএস পরীক্ষার প্রচলিত পদ্ধতিতেও পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় কমিশন। লিখিত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে নতুন পদ্ধতি, মৌখিক পরীক্ষায় দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়ন, প্রশ্নপ্রণয়নে পরিবর্তন এবং কোচিংনির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা ছিল এসব উদ্যোগের অংশ।

এ ছাড়া প্রশ্নফাঁসের ঝুঁকি কমাতে নিজস্ব ডিজিটাল প্রেস স্থাপন, পরীক্ষা সংক্রান্ত কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন ও অটোমেশন এবং খাতা মূল্যায়নের দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে দ্রুত ফল প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিসিএসের আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা করার সিদ্ধান্তও ছিল উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনগুলোর একটি।

সংস্কার উদ্যোগের পাশাপাশি পিএসসির পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টিও সামনে এনেছিলেন চেয়ারম্যান। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠিও দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে কমিশন ও প্রশাসনের মধ্যে কোনো ধরনের মতপার্থক্য তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে গুঞ্জন রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য এবং নথিভিত্তিক তথ্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।

পিএসসির কর্মকর্তাদের একাংশের মতে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া চেয়ারম্যানের সঙ্গে নতুন সরকারের কাজের সম্পর্ক কেমন ছিল, সেটিও আলোচনার বিষয়। আবার কারও কারও ধারণা, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং প্রশ্নফাঁস, নিয়োগবাণিজ্য ও তদবিরের সুযোগ কমানোর উদ্যোগে কিছু স্বার্থ সংশ্লিষ্ট মহল অস্বস্তিতে পড়ে থাকতে পারে।

সরকার তাঁকে আর চেয়ারম্যান পদে রাখতে আগ্রহী নয়, এমন কোনো বার্তা তিনি পেয়েছিলেন কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। তবে এসব বক্তব্য ও ধারণার পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এগুলোকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ মনে করেন, পিএসসির মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে।

তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলেছে, কিন্তু বাস্তবে দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা দেখা যাচ্ছে না। সরকারি পদে যোগ্য ও দক্ষ জনবল নিয়োগে পিএসসির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পরিবর্তনের কারণ তাই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

মনজুর আহমদ আরও আশঙ্কা প্রকাশ করেন, সরকার চাইলে পিএসসির চেয়ারম্যান পদে নিজেদের পছন্দের বা দলীয় ঘরানার কাউকে নিয়োগ দিতে পারে। তবে এটি তাঁর আশঙ্কা; নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের বিষয়ে সরকারের কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রমাণ হিসেবে একে বিবেচনা করা যায় না।

পিএসসির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পদত্যাগের আগের দিনও চেয়ারম্যান তাঁদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন এবং সভা করেছেন। পরদিন মঙ্গলবার সদস্যদের ডেকে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

ওই সদস্যের ভাষ্য, “চেয়ারম্যান স্যার পদত্যাগের আগের দিন আমাদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন ও সভা করেছেন। হঠাৎ মঙ্গলবার আমাদের ডেকে জানান, তিনি পদত্যাগ করবেন। কেন বা কী কারণে, তা আমরা জানি না।”

মোবাশ্বের মোনেমের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে পিএসসির সংস্কার কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা, বিসিএস পরীক্ষার নির্ধারিত সময়সীমা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর উদ্যোগগুলো কতটা এগিয়ে যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

তবে পদত্যাগের কারণ হিসেবে চেয়ারম্যান নিজে শারীরিক অসুস্থতা ও শিক্ষকতায় ফেরার ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসনিক সম্পর্ক বা সংস্কার নিয়ে বিরোধের যে আলোচনা রয়েছে, তা এখনো অভিযোগ ও অনুমানের পর্যায়ে। প্রকৃত কারণ বুঝতে তাঁর বক্তব্যের পাশাপাশি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অবস্থান, সংশ্লিষ্ট নথি এবং কমিশনের সংস্কার উদ্যোগের অগ্রগতি সম্পর্কে আরও তথ্য প্রয়োজন।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments