তানভীর রায়হান:
দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়া বিএনপির অনেক নেতাকর্মী এখন দল ও সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যথাযথ মূল্যায়ন না পাওয়ার অভিযোগ তুলছেন। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রাজপথের পরীক্ষিত নেতাদের পাশে সরিয়ে রেখে সুবিধাবাদী ও নতুন করে দলে সক্রিয় হওয়া ব্যক্তিদের প্রভাব বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রভাবশালী নেতাদের ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে তাঁদের বিতর্কিত করার চেষ্টা হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
ঢাকার রাজনীতিতে এ নিয়ে অসন্তোষ বিশেষভাবে দৃশ্যমান বলে দাবি করছেন বিএনপির একাংশের নেতাকর্মীরা। তাঁদের মতে, মির্জা আব্বাস, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আমিনুল হক, এম এ কাইয়ুম, সাইফুল আলম নিরব এবং সর্বশেষ ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে ঘিরে বিতর্কের ঘটনাগুলো দলের সাংগঠনিক পরিবেশ ও তৃণমূলের মনোবলে প্রভাব ফেলছে। তবে এসব নেতাকে পরিকল্পিতভাবে কোণঠাসা করার অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মনে করেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগ স্বীকার করা নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ায় হতাশা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “বিএনপি সরকার গঠন করেছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন, নিঃস্ব হয়েছেন তাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারিনি। আবার কিছু সুবিধাবাদী ঢুকে পড়েছে, এটি ত্যাগীদের জন্য হতাশার।”
গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, এই হতাশা থেকে অনেকে দলীয় কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন এবং ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। এর দায় দলের নেতাদেরই নিতে হবে উল্লেখ করে তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন।
সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সাবেক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে ঘিরে বিতর্ক এ আলোচনাকে আরও জোরালো করেছে। বিএনপির একাংশের দাবি, মাদকবিরোধী তৎপরতার লক্ষ্যকে সামনে না এনে তাঁর কর্মকাণ্ডের পদ্ধতি ও সংশ্লিষ্ট ঘটনাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করা হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, এর ফলে তাঁকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তবে ইশরাকের কর্মকাণ্ডের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ইসলামি বক্তা ও জৈনপুরী দরবার শরীফের পীর মুফতি ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী বলেন, ইশরাকের মাদকবিরোধী উদ্যোগের উদ্দেশ্য ভালো হলেও পদ্ধতি সঠিক ছিল না। তাঁর মতে, সরকারও এ ঘটনার দায় নিতে চায়নি।
গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে আব্বাসী বলেন, মাদকবিরোধী তৎপরতার ইতিবাচক দিক তুলে না ধরে ঘটনাটির বিতর্কিত অংশকে বেশি প্রচার করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, এতে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতে আগ্রহীরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
দৈনিক জবান সম্পাদক রেজাউল করিম রনিও গণমাধ্যমে রাজনৈতিক ‘ফ্রেমিং’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর অভিযোগ, ইশরাকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে গুজব ও একপক্ষীয় প্রচারণার মাধ্যমে মূল বিষয় আড়াল করা হয়েছে।
বিএনপির কয়েকজন নেতাকর্মীর দাবি, ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে ঢাকার প্রভাবশালী নেতাদের একের পর এক বিতর্কের মুখে পড়তে হয়েছে। তাঁদের তালিকায় রয়েছেন মহানগর উত্তরের সাবেক নেতা সাইফুল আলম নিরব, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, দক্ষিণের তানভীর আহমেদ রবীন, উত্তরের আমিনুল হক, এম এ কাইয়ুম এবং ইশরাক হোসেন।
তাঁদের অভিযোগ, এসব নেতাকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচারণা দলকে সাংগঠনিকভাবে দুর্বল করতে পারে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় এ ধরনের বিতর্ক রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা হতে পারে বলেও তাঁরা আশঙ্কা করছেন। তবে অভিযোগগুলোর পেছনে কারা রয়েছে বা এগুলোর মধ্যে সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
বিএনপির নেতাদের মতে, ঢাকার রাজনীতিতে সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক উত্তরসূরি হিসেবে ইশরাক, মির্জা আব্বাস, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, আমিনুল হক ও এম এ কাইয়ুমের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। তাঁদের ঘিরে বিতর্ক ও বিভক্তি দলের নির্বাচনী প্রস্তুতি এবং সাংগঠনিক ঐক্যে প্রভাব ফেলতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন।
দলীয় সরকারের ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন—এমন প্রত্যাশা ছিল তৃণমূলের অনেকের। কিন্তু তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘ আন্দোলনের কঠিন সময়ে যাঁরা সক্রিয় ছিলেন না, তাঁদের কেউ কেউ এখন প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করছেন।
রাজশাহী বিএনপির এক নেতা বলেন, বছরের পর বছর মামলা, হামলা ও কারাবাসের মুখোমুখি হওয়ার পরও তাঁরা এখন নিজেদের দাবি নিয়ে কথা বলার ক্ষেত্রে বাধার মুখে পড়ছেন। তাঁর অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে রাজপথে যাঁদের দেখা যায়নি, তাঁদেরই এখন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক নেতাও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর মতে, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালের মতো নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে অন্য নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
ইশরাক হোসেনের সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ড. মাহ্দী আমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তিনি ইশরাকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেন।
মাহ্দী আমিন বলেন, ইশরাকের সাম্প্রতিক কাজের পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন বা মতভিন্নতা থাকতে পারে। তবে যে উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তার লক্ষ্য ও নৈতিকতা নিয়ে তাঁর দ্বিধা নেই। প্রতিমন্ত্রীর পদ বা পদত্যাগপত্র দিয়ে ইশরাকের রাজনৈতিক পরিচয় ও আত্মত্যাগ মূল্যায়ন করা যায় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার নীতি বজায় থাকবে। কোনো উদ্যোগ নিয়ে বিতর্ক দেখা দিলে সেখানেও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল ও সরকার, উভয় ক্ষেত্রেই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে চান। তাঁর অভিযোগ, সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ শুরু করার পর থেকেই একটি শ্রেণি বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে।
বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ত্যাগের স্বীকৃতি, নেতৃত্বের মূল্যায়ন ও দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ নিয়ে যে অসন্তোষের কথা উঠে এসেছে, তা দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকার প্রভাবশালী নেতাদের অবস্থান, তৃণমূলের সক্রিয়তা এবং দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তবে নেতাদের ঘিরে প্রচারণা পরিকল্পিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী তাঁদের কোণঠাসা করছে কি না, এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন। একইভাবে যেসব নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা বিতর্ক রয়েছে, সেগুলোরও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন জরুরি।
দলীয় নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে একদিকে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের আন্দোলনে ভূমিকা রাখা নেতাকর্মীদের আস্থা ও সক্রিয়তা ধরে রাখা।



