তানভীর রায়হান:
চিত্রনায়িকা মেঘলা মুক্তার জীবনে ২৮ জুলাইয়ের সড়ক দুর্ঘটনা শুধু শারীরিক ক্ষত তৈরি করেনি, শুরু করেছে আরেক লড়াই, ন্যায়বিচার পাওয়ার লড়াই। দীর্ঘদিন আইসিইউ ও হাসপাতালে চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেও দুর্ঘটনার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার অগ্রগতি নিয়ে হতাশ তিনি। তাঁর অভিযোগ, ঘটনার পর প্রয়োজনীয় তথ্য পুলিশের হাতে পৌঁছালেও তদন্তে বিলম্ব হয়েছে, তাঁর বক্তব্য নেওয়া হয়নি এবং অভিযোগ নিবন্ধন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। এখন তাঁর প্রধান চাওয়া, দীর্ঘসূত্রতা কাটিয়ে দ্রুত তদন্ত শেষ করা এবং আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া। নিজের অভিজ্ঞতা, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন এবং বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে হতাশার কথা সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ ডটকম-এর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেছেন মেঘলা মুক্তা।
প্রশ্ন: দুর্ঘটনার পর আপনার জীবন যেন হাসপাতাল থেকে আদালতের লড়াইয়ে এসে ঠেকেছে। এই পরিস্থিতিকে কীভাবে দেখছেন?
মেঘলা মুক্তা: দুর্ঘটনার পর প্রথম লড়াই ছিল বেঁচে থাকা। আইসিইউতে ছিলাম, দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। তখন আমার পরিবার চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। ধীরে ধীরে সুস্থ হওয়ার পর বুঝতে পারলাম, দুর্ঘটনার বিচার পেতে আরেকটি দীর্ঘ লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আমার বাবা নিয়মিত আদালতে যাচ্ছেন, অভিযুক্ত পক্ষের জামিনের আবেদন মোকাবিলা করছেন। আমার শরীর এখনো পুরোপুরি সুস্থ নয়। এই অবস্থায় মামলা চালানো খুব কঠিন। কখনো মনে হয়, বেঁচে ফিরে নিজের অধিকারের জন্য লড়াই করাটাই যেন নতুন শাস্তি।
প্রশ্ন: আপনার অভিযোগ, দুর্ঘটনার পরপরই কার্যকর তদন্ত শুরু হলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। কেন এমন মনে করছেন?
মেঘলা মুক্তা: দুর্ঘটনার পর আমার বন্ধু ও সহকর্মীরা থানায় গিয়েছিলেন। অভিনেতা ইমতিয়াজ বর্ষণ আমার পক্ষে অভিযোগ করেছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা আমার বক্তব্য নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। আমি তখন আইসিইউতে থাকায় তা সম্ভব হয়নি। পরে সাধারণ বেডে যাওয়ার পরও আমার পরিবারের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। কিন্তু আমার বক্তব্য নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করছি। পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যও নেওয়া হয়নি। আমার প্রশ্ন, একজন গুরুতর আহত মানুষের বক্তব্য নেওয়া তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলে এত দিনেও তা কেন করা হলো না?
প্রশ্ন: অভিযোগ নিবন্ধন নিয়ে যে অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, সেটি কীভাবে জানতে পারেন?
মেঘলা মুক্তা: ১ সেপ্টেম্বর আমার বাবা থানায় গিয়ে দুর্ঘটনার বিষয়ে জানতে চান। তখন থানার প্রধান কর্মকর্তা প্রথমে ঘটনাটি সম্পর্কে জানেন না বলে জানান। বাবা অভিযোগের কাগজ দেখানোর পর জানতে পারেন, সেটি থানার কম্পিউটার সিস্টেমে নিবন্ধিত হয়নি। অথচ তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে আমরা জানতাম। বিষয়টি আমাদের কাছে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। অভিযোগ নিবন্ধিত না হলে তদন্তের প্রক্রিয়া কীভাবে এগোল, আর থানার প্রধান কর্মকর্তা কেন ঘটনাটি জানতেন না, এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা চাই।
প্রশ্ন: দুর্ঘটনার গাড়ি শনাক্ত করার মতো তথ্য কি পুলিশের কাছে ছিল?
মেঘলা মুক্তা: আমাদের জানা অনুযায়ী, দুর্ঘটনার সময় পেছনে থাকা আরেকটি গাড়ির চালক পুরো ঘটনাটি ভিডিও করেছিলেন। তাঁর নাম নেহাল। তিনি দুর্ঘটনায় জড়িত গাড়ির নম্বর সংগ্রহ করে ৯৯৯-এ ফোন করেন এবং পরে বনানী থানায় গিয়ে ভিডিওসহ তথ্য দেন। অর্থাৎ, গাড়িটি শনাক্ত করার মতো তথ্য পুলিশের কাছে পৌঁছেছিল বলে আমাদের ধারণা। তারপরও কেন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হলো না, সেটি বুঝতে পারছি না। তবে প্রকৃত চালক কে ছিলেন এবং ঘটনার জন্য কে দায়ী, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া উচিত।
প্রশ্ন: ১ সেপ্টেম্বর অভিযোগ নিবন্ধনের পর কী পরিবর্তন দেখেছেন?
মেঘলা মুক্তা: ১ সেপ্টেম্বর বাবা আবার অভিযোগ করেন এবং নিজে উপস্থিত থেকে মামলাটি নিবন্ধন করান। ৩ সেপ্টেম্বর রাতে তদন্ত কর্মকর্তা বাবাকে ফোন করে জানান, দুর্ঘটনায় জড়িত গাড়ি ও চালককে আটক করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন, ২৮ জুলাইয়ের দুর্ঘটনার পরই যদি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়ে থাকে, তাহলে এত দিন অপেক্ষা করতে হলো কেন? শুরুতেই উদ্যোগ নেওয়া হলে আমরা অন্তত জানতে পারতাম যে তদন্ত এগোচ্ছে। এই বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।
প্রশ্ন: পুলিশের ভূমিকা নিয়ে আপনার ক্ষোভ কি পুরো পুলিশ বাহিনীর প্রতি অনাস্থায় পরিণত হয়েছে?
মেঘলা মুক্তা: আমি আমার অভিজ্ঞতা থেকেই কথা বলছি। সব পুলিশ সদস্যকে একভাবে বিচার করতে চাই না। কিন্তু আমার ঘটনায় যেসব অসংগতি দেখেছি, সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আমার আছে। আগের একটি গাড়ি দুর্ঘটনার সময়ও পুলিশের একজন কর্মকর্তার আচরণ নিয়ে আমার অভিযোগ ছিল। বনানীর ঘটনায়ও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছি। আমি চাই, এসব অভিযোগকে ব্যক্তিগত ক্ষোভ হিসেবে না দেখে যথাযথভাবে যাচাই করা হোক। দায়িত্বে অবহেলা হয়ে থাকলে তারও জবাবদিহি থাকা দরকার।
প্রশ্ন: এখন আপনার সবচেয়ে জরুরি দাবি কী?
মেঘলা মুক্তা: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও মেডিকেল রিপোর্ট আমরা তদন্ত কর্মকর্তাকে দিয়েছি। বনানী থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অনুরোধ, তিনি যেন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখেন এবং দ্রুত আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। অভিযোগপত্র না হওয়ায় বারবার আদালতে যেতে হচ্ছে। আমার বাবা বয়স্ক, তাঁকেই অধিকাংশ দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। অভিযুক্ত পক্ষ জামিনের আবেদন করলে তা মোকাবিলা করাও পরিবারের জন্য চাপের। আমি চাই, আইন অনুযায়ী তদন্ত শেষ হোক, যাতে বিচারপ্রক্রিয়া অযথা দীর্ঘ না হয়।
প্রশ্ন: এই অভিজ্ঞতার পর বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আপনার উপলব্ধি কী?
মেঘলা মুক্তা: আমার মনে হয়েছে, বিচার পেতে গিয়ে মানুষ একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। একটি দুর্ঘটনার পর ভুক্তভোগীকে চিকিৎসা, শারীরিক যন্ত্রণা, মানসিক চাপ এবং আইনি প্রক্রিয়া, সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হয়। তদন্তে বিলম্ব হলে সেই কষ্ট আরও বাড়ে। আমি কখনো কখনো এতটাই হতাশ হয়ে পড়ি যে মনে হয়, আমি যদি বেঁচে না ফিরতাম, হয়তো বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে এত প্রশ্ন তুলতে হতো না। কিন্তু আমি বেঁচে আছি, তাই নিজের অধিকার চাইছি। আমার মতো অন্য কেউ যেন এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি না হন, সেটিই চাই।
প্রশ্ন: শারীরিক সুস্থতা ও আইনি লড়াই, দুটির মধ্যে ভারসাম্য রাখবেন কীভাবে?
মেঘলা মুক্তা: এখনো পুরোপুরি সুস্থ হইনি। মুখের ক্ষতসহ শারীরিক সমস্যাগুলো থেকে সেরে উঠতে সময় লাগবে। স্বাভাবিক জীবনে ফেরা ও কাজে ফিরে যাওয়াও আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মামলা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে মানসিকভাবে স্বস্তি পাওয়া কঠিন। আমি আইনি লড়াই চালিয়ে যেতে চাই, তবে চাই প্রক্রিয়াটি দ্রুত এগোক। আমার বক্তব্য ও অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা হোক, প্রকৃত ঘটনা সামনে আসুক এবং আইন অনুযায়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত হোক।



