দিনাজপুর প্রতিনিধি:
পড়ালেখার জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য স্টেশনারি সামগ্রী। আর সেই শিক্ষা সামগ্রীর দাম বাড়ায় বাড়তি চাপ পড়ছে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। শিক্ষাবর্ষের শেষ ভাগেও এসে বাড়ছে কলম, খাতা, পেনসিল, জ্যামিতি বক্সসহ বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণের দাম। এতে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে দামবৃদ্ধি এ দেশে নতুন নয়, কিন্তু শেষে এসে দাম বাড়ার নজির আগে দেখা যায়নি।
দিনাজপুরের স্টেশনারি পণ্যের জন্য পরিচিত মুন্সিপাড়ায় বিভিন্ন স্টেশনারি ঘুরে দেখা গেছে, মান ও ব্র্যান্ড ভেদে শিক্ষা সামগ্রীর দামে বেশ পার্থক্য রয়েছে। একই পণ্যের দাম দোকান ভেদেও ভিন্ন। আবার মাসের শুরুতে এক রকম ও মাসের শেষে আরেক রকম দামে বিক্রি হচ্ছে মনোহারি সামগ্রী।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাগজ তৈরির কাঁচামালের দাম, পরিবহন ব্যয়, উৎপাদন খরচ এবং বাজারের চাহিদার ওপর শিক্ষা উপকরণের দাম নির্ভর করে। তবে এবার শিক্ষাবর্ষের শেষ সময়ে এসেও কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে।
পাইকারি বাজারে ৫ টাকার ম্যাটাডোর কলম এখন ৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে একই ধরনের কলমের দাম উঠেছে প্রায় ১০ টাকা। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, বাজারে ৫ টাকা দামের কলম এখন প্রায় নেই বললেই চলে। এখন সাধারণত একটি কলম বিক্রি করা হয় না। জোড়া কলম বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়।
পাইকারি বাজারে ৬৫ গ্রাম ওজনের অফসেট কাগজের প্যাকেট ৩৩০ টাকা, ৮০ গ্রামের কাগজ ৪০০ টাকা এবং ১০০ গ্রামের কাগজ ৫৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, এক বছরের ব্যবধানে প্রতি প্যাকেট কাগজের দাম বেড়েছে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা।
এছাড়া মানভেদে প্রতিটি ইরেজার ১০ থেকে ১৫ টাকা, পেনসিল ১০ থেকে ২০ টাকা, স্টেপলার পিনের বাক্স ১৭০ থেকে ৪৫০ টাকা, স্টেপলার মেশিন ১৮০ থেকে ২২০ টাকা, জ্যামিতি বক্স ৭৫ থেকে ১৫০ টাকা, প্রতি রিম কাগজ ৩৭০ থেকে ৫৪০ টাকা এবং কালার পেনসিলের বক্স ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি পণ্যে দাম প্রকার ভেদে ৫ টাকা থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। স্কচটেপ, কাটার, কার্টিজ পেপার, রং পেনসিল ও আর্ট পেপারের দামও বেড়েছে। সব ধরনের ডায়রি, রেজিস্টার, রেজুলেশন ও লেজার বইয়ের দামও বেড়েছে। বাড়বে নতুন বছরের ক্যালেন্ডারের দামও।
দিনাজপুর পেপার অ্যান্ড স্টেশনারি মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক এবং ‘মা লাইব্রেরি ও স্টেশনারি’র মালিক এ এস এম মাঈনুদ্দিন বলেন, আগের তুলনায় খাতা ও কলমের দাম বেড়েছে। বিশেষ করে কলম ও অফসেট কাগজের দাম বেড়েছে। ৫ টাকার ম্যাটাডোর কলম এখন ৭ টাকা থেকে সাড়ে ৭ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। কাগজের দাম বাড়ায় খাতা বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। সব ধরনের শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে। কাগজ তৈরির কাঁচামাল, কালি আমদানি খরচ, পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সবকিছুর দাম বাড়ছে।
মুন্সিপাড়া এলাকার খুচরা স্টেশনারি ব্যবসায়ী মনির উদ্দিন বলেন, আগে যে ধরনের খাতা ১৫ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ৩০ থেকে ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। সম্প্রতি কলমের দামও বেড়েছে। বাজারে ৫ টাকা দামের কলম নেই বললেই চলে। আবার অনেক সময় নিম্নমানের সামগ্রী বাজারে আসছে। সব মিলিয়ে আগামী মাসে আরও দাম বাড়তে বলে মনে হচ্ছে।
বাহাদুর বাজারের ভাই ভাই স্টোরের মালিক আইয়ুব আলী বলেন, স্টেশনারি সামগ্রী মাসের প্রথমে বেশি দামে বিক্রি হয়, আবার মাসের শেষে কিছুটা দাম কমে। এর দুটি কারণ মাসের প্রথমে মানুষের কাছে টাকা থাকে তাই তারা দাম বেশি হলেও কিনে থাকেন। আবার মাসের শেষে টাকার ঘাটতি থাকায় দামাদামি করে পণ্য ক্রয় করেন ক্রেতারা। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কোম্পানিগুলোও মাসের শুরুতে জিনিসের দাম বাড়ায়, আবার মাসের শেষে অফার দিয়ে দাম কমায়।
ফেরি করে বিভিন্ন উপজেলায় খাতা কলম ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ বিক্রেতা রমজান আলী বলেন, আমি নিজে খাতা তৈরি করি। প্রতি রিম কাগজের দাম ওজন ভেদে ৪০ টাকা থেকে ৭০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তাই খাতার দামও ৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। আবার অনেক সময় কাগজ কিনতে গিয়ে কত জিএসএম কাগজ কিনছি চিনতে না পারলে ঠকতে হয়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই খাতা-কলমসহ শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়ে। কিন্তু এবার বছরের মাঝামাঝি সময়েও দাম বাড়ায় তাদের বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে। শিক্ষাবর্ষের শুরুতে দাম বাড়ার নজির থাকলেও, শেষে দাম বাড়ার নজির এবারই প্রথম।
অভিভাবক আসাদ বলেন, একটি সন্তানের জন্য একসঙ্গে অনেকগুলো খাতা, কলম, পেনসিল ও অন্যান্য শিক্ষা উপকরণ কিনতে হয়। কোনো একটি পণ্যের দাম খুব বেশি না হলেও সব মিলিয়ে খরচ অনেক বেড়ে যায়। তাই দাম কম থাকলে অভিভাবকদের জন্য সুবিধা হয়। এবার আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে সব শিক্ষা উপকরণের দাম বেড়েছে।
তিনি বলেন, আমি একজন কৃষক, আমার কোনো পণ্যে দাম বাড়েনি, তাই মেয়ের জন্য খাতা কলম, পেনসিল, রং পেনসিল কিনতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চাকরিজীবীদের বেতন বাড়বে, তাদেরতো কোনো চিন্তা নেই।
রাজবাড়ী এলাকার বাসিন্দা লক্ষণ সরকার বলেন, ‘৫ টাকা দামে এখন আর দোকানে একটি কলমও পাওয়া যায় না। নীরবে শিক্ষাসামগ্রীর দাম বেড়েই চলেছে। এখনই লাগাম টানতে না পারলে আগামী শিক্ষাবর্ষে ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে।’
অভিভাবক ফরিদুল ইসলাম বলেন, শিক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম যেন অস্বাভাবিকভাবে না বাড়ে, সে বিষয়ে বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি শিক্ষা উপকরণের বাজারেও কার্যকর নজরদারি না থাকলে এর সরাসরি চাপ পড়বে শিক্ষার্থী ও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর।
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, কাগজ কলমের দাম বাড়লে শিক্ষার ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। আগামীতে যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বৃত্তি এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে তাতে খরচ বেড়ে যাবে। একটা সময় গিয়ে এই প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি পড়বে।


