তানভীর রায়হান:
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে ব্যাংক হিসাবে ভাতার টাকা না পৌঁছানো, এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) ওয়েবসাইট বন্ধ থাকা এবং মাঠপর্যায়ে ভাতা যাচাই-বাছাইয়ের কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ—সব মিলিয়ে ভাতাভোগীদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মাসের ২৮ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে ভাতার টাকা পেলেও এবার তা না পাওয়ায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন একাধিক বীর মুক্তিযোদ্ধা।
এদিকে এমআইএস সফটওয়্যারে সংশোধনের কাজ চলায় ওয়েবসাইটটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে ওয়েবসাইটটি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাকিলুজ্জামান। তবে ভাতার অর্থ ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়ার বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানা যায়নি।
ভাতাভোগী মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযোগ, আগে প্রতি মাসের ২৮ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে তাঁদের ব্যাংক হিসাবে সম্মানী ভাতার অর্থ জমা হতো। কিন্তু এবার নির্ধারিত সময় পার হলেও টাকা না পাওয়ায় তাঁদের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে সমস্যা হচ্ছে। অনেকেই সংসারের খরচ মেটাতে ধারদেনা করতে বাধ্য হচ্ছেন।
একাধিক মুক্তিযোদ্ধা বলেন, বয়সের কারণে তাঁদের অনেকেরই নিয়মিত আয়ের অন্য কোনো উৎস নেই। মাসিক সম্মানী ভাতার ওপর নির্ভর করেই সংসারের ওষুধ, চিকিৎসা, খাবারসহ প্রয়োজনীয় খরচ চালাতে হয়। নির্ধারিত সময়ে ভাতা না পেলে তাঁদের বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হয়। ভাতা প্রদানে বিলম্বের কারণ দ্রুত জানানো এবং ব্যাংক হিসাবে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাকিলুজ্জামান বলেন, এমআইএস সফটওয়্যারে প্রয়োজনীয় সংশোধনের কাজ চলছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে ওয়েবসাইটটি চালু করা সম্ভব হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, পিএসপি-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটগুলোতে বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ কারণে সাময়িকভাবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
তবে ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা ব্যাংক হিসাবে জমা না হওয়ার সরাসরি সম্পর্ক কী, কিংবা ওয়েবসাইট চালু হলেই ভাতা বিতরণ স্বাভাবিক হবে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা বিতরণের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য জেলা, উপজেলা ও মহানগর পর্যায়ের বিদ্যমান কমিটিগুলো জরুরি ভিত্তিতে পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়।
গত ১ নভেম্বর মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন-১ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি জারি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব খান মো. আব্দুল আল মামুন স্বাক্ষরিত চিঠিটি দেশের সব জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নির্দেশনার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংশ্লিষ্ট সব শাখার মাঠপর্যায়ের কমিটিগুলো পুনর্গঠন করতে হবে।
এতে ‘বীর মুক্তিযোদ্ধা সম্মানী ভাতা বিতরণ আদেশ, ২০২০’-এর ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সম্মানী ভাতা পাওয়ার জন্য দাখিল করা আবেদন যাচাই-বাছাই করতে উপজেলা পর্যায়ে উপজেলা কমিটি এবং মহানগর পর্যায়ে মহানগর কমিটি গঠনের নির্দেশনা রয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বিদ্যমান কমিটিগুলো জরুরি ভিত্তিতে পুনর্গঠন এবং পুনর্গঠিত কমিটির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরবর্তী কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কমিটি পুনর্গঠন ও এমআইএস সফটওয়্যারে সংশোধনের উদ্যোগের মধ্যে ভাতাভোগীদের প্রধান উদ্বেগ এখন অর্থ পাওয়ার সময় নিয়ে। বিশেষ করে যাঁরা নিয়মিত চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ মেটাতে সম্মানী ভাতার ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য বিলম্ব বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ভাতা বিতরণের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের জন্য মাঠপর্যায়ে কার্যকর কমিটি থাকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিদ্যমান কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ এবং এমআইএস সফটওয়্যারের সংশোধন—দুটি কার্যক্রমের কারণে ভাতা বিতরণে কোনো অতিরিক্ত বিলম্ব তৈরি হবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধাদের একটি বড় অংশের বয়স হয়েছে। তাঁদের অনেকের নিয়মিত আয় বা বিকল্প আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা নেই। ফলে সম্মানী ভাতা শুধু একটি সরকারি আর্থিক সুবিধা নয়, তাঁদের দৈনন্দিন জীবনযাপনেরও গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন।
এ অবস্থায় এমআইএস ওয়েবসাইট দ্রুত চালু করা, মাঠপর্যায়ের কমিটি পুনর্গঠন সম্পন্ন করা এবং ভাতা বিতরণের সময়সূচি স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ভাতার অর্থ আটকে থাকার প্রকৃত কারণ এবং কবে নাগাদ তা ব্যাংক হিসাবে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য প্রত্যাশা করছেন ভাতাভোগীরা।
প্রযুক্তিগত সমস্যা বা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে যেন বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়মিত সম্মানী ভাতা প্রাপ্তি দীর্ঘায়িত না হয়, সেটিই এখন তাঁদের প্রধান প্রত্যাশা।



