Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়বিশ্বরাজনীতির নতুন খেলা: ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে বঙ্গোপসাগর, বদলে যাচ্ছে বিশ্ব ব্যবস্থা

বিশ্বরাজনীতির নতুন খেলা: ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে বঙ্গোপসাগর, বদলে যাচ্ছে বিশ্ব ব্যবস্থা

তানভীর রায়হান:

বিশ্ব এখন এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক আধিপত্য, সবকিছু মিলিয়ে পৃথিবী যেন এক জটিল দাবার বোর্ড। এই বোর্ডে কে চাল দিচ্ছে, কে প্রতিপক্ষকে ঘিরে ফেলছে, আর কে নীরবে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করছে, তা বাইরে থেকে সব সময় বোঝা যায় না। দৃশ্যমান সংঘাতের আড়ালে চলে আরও বড় এক প্রতিযোগিতা। সেখানে কখনো অস্ত্রের ব্যবহার হয়, কখনো অর্থনীতির, কখনো কূটনীতির, আবার কখনো সমুদ্রের গভীরে থাকা সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয় অদৃশ্য লড়াই।

বিশ্বের বর্তমান অস্থিরতার জন্য বাংলাদেশকে কোনোভাবেই প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক সময় আন্তর্জাতিক শক্তির প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে ওঠে, কিন্তু সেই প্রতিযোগিতার মূল পরিকল্পনাকারী হয় বৃহৎ শক্তিগুলো। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থের সংঘাতই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে।

তবে আগামী দিনের বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য থাকলেও সেই অবস্থান ভবিষ্যতেও একই রকম থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা, ভারতের ক্রমবর্ধমান বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ও বিনিয়োগ সক্ষমতা বিশ্বক্ষমতার ভারসাম্যে নতুন মাত্রা যোগ করছে।

আগামী দিনের অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতায় চীন, ভারত এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আরও সামনে আসতে পারে। বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের মতো রাষ্ট্রগুলো জ্বালানি অর্থনীতির বাইরে প্রযুক্তি, অবকাঠামো, বিনিয়োগ, পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নিজেদের অবস্থান বিস্তৃত করছে। অন্যদিকে চীন উৎপাদন, প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। ভারতও জনসংখ্যা, বাজার, প্রযুক্তি এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র রাতারাতি বিশ্বমঞ্চ থেকে উৎখাত হয়ে যাবে। বরং প্রশ্নটি হচ্ছে, একক আধিপত্যের জায়গায় বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে কি না। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে হয়তো কোনো একটি রাষ্ট্র সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। বরং বিভিন্ন অঞ্চলের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বলয় তৈরি করবে।

এই বৃহৎ প্রতিযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হতে পারে বঙ্গোপসাগর।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগর শুধু বাংলাদেশের জলসীমা নয়; এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি পরিবহন এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগব্যবস্থায় এর কৌশলগত গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ডসহ আশপাশের দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত স্বার্থ এই সাগরের সঙ্গে যুক্ত।

বঙ্গোপসাগরের তলদেশে কী পরিমাণ প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের সম্ভাবনা কতটা, গভীর সমুদ্রের ভূতাত্ত্বিক গঠন কেমন এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ আহরণের সুযোগ তৈরি হতে পারে—এসব বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন। সমুদ্রের ওপরিভাগে জাহাজ চলাচল দৃশ্যমান হলেও এর গভীরে রয়েছে এমন অনেক অজানা বিষয়, যা ভবিষ্যতের অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্র ও মহাসাগর নিয়ে গবেষণা, অনুসন্ধান এবং বিনিয়োগ চলছে। বঙ্গোপসাগর নিয়েও গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। তবে এর গভীর সমুদ্রসম্পদ, ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, সামুদ্রিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আরও সমন্বিত এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় একটি সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। বাংলাদেশ যদি বঙ্গোপসাগরকে কেবল ভৌগোলিক সীমানা হিসেবে না দেখে অর্থনৈতিক সম্পদ, গবেষণা, যোগাযোগ এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করে, তাহলে ভবিষ্যতে তার অবস্থান অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দক্ষ গবেষক, আধুনিক প্রযুক্তি, সমুদ্রবিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী নয়, কোনো প্রতিযোগিতার ফলাফলও আগে থেকে নিশ্চিত নয়। আজ যে রাষ্ট্র মিত্র, আগামীকাল স্বার্থের সংঘাতে সে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। আবার আজকের প্রতিদ্বন্দ্বী আগামী দিনে অর্থনৈতিক সহযোগিতার অংশীদার হতে পারে।

পৃথিবী যেন এক রোমাঞ্চকর খেলার মাঠ। কিন্তু এই খেলায় সাধারণ মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। কে কাকে নিয়ে কখন, কীভাবে খেলছে, তা সব সময় আমাদের চোখে পড়ে না। অনেক সময় দৃশ্যমান ঘটনার পেছনে কাজ করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, অদৃশ্য সমঝোতা এবং কৌশলগত হিসাব।

তাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যের খেলায় কেবল ঘুঁটি হয়ে না থাকা। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের সক্ষমতা, গবেষণা ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতা বাড়ানো। কারণ ভবিষ্যতের বিশ্বরাজনীতিতে কে কত শক্তিশালী, তা শুধু তার স্থলভাগের আয়তন কিংবা সামরিক অস্ত্রের সংখ্যায় নির্ধারিত হবে না; সমুদ্র, প্রযুক্তি, জ্বালানি, বাণিজ্য এবং জ্ঞান নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতাও নির্ধারণ করবে ক্ষমতার নতুন মানচিত্র।

হয়তো আগামী দিনের পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গল্পটি লেখা হবে সমুদ্রের বুকে, আর সেই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়ের নাম হতে পারে বঙ্গোপসাগর।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments