রায়হান আহমেদ:
রাজধানীর বস্তিগুলোতে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের সরকারি সরবরাহ লাইন থাকলেও নির্ধারিত দামে এসব সেবা পাচ্ছেন না নিম্ন আয়ের মানুষ। বৈধ ব্যক্তিগত সংযোগের সুযোগ সীমিত হওয়ায় একটি মিটার বা অনুমোদিত সংযোগের ওপর নির্ভর করে গড়ে উঠেছে অনানুষ্ঠানিক সরবরাহব্যবস্থা। আর সেই ব্যবস্থায় সরকারি দরের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নানা ধরনের অতিরিক্ত খরচ।
কড়াইল, কল্যাণপুর পোড়া বস্তি ও ভাসানটেকের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কোথাও প্রতি ইউনিট ১৩ টাকা, কোথাও ১৫ থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। পানির জন্য পরিবারপ্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং এক চুলার গ্যাস সংযোগের জন্য ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে।
ফলে স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর মাসিক জীবনযাত্রার ব্যয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ চলে যাচ্ছে মৌলিক ইউটিলিটি সেবার পেছনে।
কড়াইলের গৃহকর্মী জান্নাত বেগমের এক কক্ষের ঘরে একটি পাখা ও একটি বাতি। তারপরও বিদ্যুতের জন্য তাকে মাসে ৬০০ টাকা দিতে হয়। হিসাব অনুযায়ী, ৬৫ ওয়াটের একটি পাখা দিনে ২২ ঘণ্টা এবং ৪০ ওয়াটের একটি বাতি দিনে আট ঘণ্টা ব্যবহার করলে মাসে বিদ্যুৎ খরচ হয় প্রায় ৫২ দশমিক ৫ ইউনিট। সরকারি আবাসিক হারে এ ব্যবহারের বিল ৪৫০ টাকার নিচে থাকার কথা।
এর বাইরে জান্নাতকে পানি বাবদ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা এবং এক চুলার গ্যাস সংযোগের জন্য আরও ৫০০ টাকা দিতে হয়। সব মিলিয়ে সরকারি সেবার নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় তার পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।
বস্তিগুলোতে ব্যক্তিগত বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে নানা ধরনের কাগজপত্র ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক পরিবারকে একটি প্রধান মিটারের আওতায় বিদ্যুৎ দেওয়া হয়। পরে প্রতিটি পরিবারে সাবমিটার বা পৃথক লাইনের মাধ্যমে সংযোগ পৌঁছায়।
ডেসকোর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, একটি প্রধান মিটারের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২০টি পরিবারকে বিদ্যুৎ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে আবাসিক গ্রাহকের নির্ধারিত হার প্রযোজ্য। তবে বাস্তবে কিছু জায়গায় স্থানীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা পরিচালিত হচ্ছে।
কড়াইলে বাসিন্দাদের দেখানো চারটি প্রধান মিটারের একটির মাধ্যমে ১৭৯টি পরিবারকে বিদ্যুৎ দেওয়ার কথা জানা গেছে। ওই মিটারের মালিক জামাল জানান, তার ১৩৯ জন গ্রাহকের সাবমিটার রয়েছে। বাকি ৪০ জনকে সরাসরি লাইন দেওয়া হয়েছে।
জামালের দাবি, সাবমিটার ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে তিনি প্রতি ইউনিট ১৩ টাকা এবং সরাসরি সংযোগ নেওয়া পরিবারগুলোর কাছ থেকে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপ্রতি ২৫০ টাকা নেন। অথচ তার জুন মাসের ডেসকোর বিল অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য তিনি ৭ টাকা ৪৭ পয়সা দিয়েছেন।
এখানেই তৈরি হচ্ছে সরকারি বিল ও গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করা অর্থের মধ্যে বড় ব্যবধানের প্রশ্ন।
কড়াইলে বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত আরেক পক্ষের দাবি, স্থানীয়ভাবে লাইন রক্ষণাবেক্ষণ, বিল সংগ্রহ ও সমস্যা সমাধানের জন্য কর্মী রাখতে হয়। এ কারণে গ্রাহকদের কাছ থেকে সরকারি বিলের চেয়ে বেশি অর্থ নেওয়া হয়।
বনানী থানা মহিলা দলের যুগ্ম আহ্বায়ক আসমা বেগমও একই ধরনের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষ্য, ডেসকোর কর্মীরা সব সময় সমস্যা সমাধানে সহায়তা করতে পারেন না। ফলে স্থানীয়ভাবে কয়েকজন কর্মী নিয়োগ দিয়ে সেবা সচল রাখতে হয় এবং তাদের খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকেই নেওয়া হয়।
তবে এ ধরনের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ক্ষেত্রে গ্রাহকদের জন্য নির্ধারিত কোনো সরকারি কাঠামো বা মূল্যতালিকা নেই। ফলে একজন বাসিন্দা ঠিক কত টাকা দেবেন, তার স্বচ্ছ হিসাবও অনেক ক্ষেত্রে থাকে না।
কল্যাণপুর পোড়া বস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, সেখানে কোনো কোনো সিন্ডিকেট প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ১৫ থেকে ১৮ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। এক সময় দাম কমলেও পরে তা আবার বেড়েছে বলে জানান বাসিন্দারা।
বিদ্যুতের মতো গ্যাসের ক্ষেত্রেও অনানুষ্ঠানিক সংযোগের ওপর নির্ভরশীল কড়াইলের অনেক পরিবার। বাসিন্দাদের ভাষ্য, এক চুলার জন্য মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং দুই চুলার জন্য ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
কড়াইলে প্রায় ৫০টি পরিবারকে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছেন জামাল। তিনি দাবি করেন, গ্যাসের টাকা অন্য একজনের কাছে দেওয়া হয় এবং লাইনও তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন না।
তবে গ্যাসলাইন নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই ব্যক্তি। তার দাবি, তিনি কেবল একজন কর্মী হিসেবে কাজ করেন।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপক শাহ নেওয়াজ চৌধুরী বলেন, অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার পর স্থানীয়ভাবে তা আবারও যুক্ত করা হয়। তিতাসের কিছু কর্মকর্তা এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, শুধু তিতাসের একার পক্ষে এ সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়।
কড়াইল বস্তিতে বিভিন্ন সংস্থা ও এনজিওর সহায়তায় প্রায় দেড় হাজার মিটারযুক্ত পানির সংযোগ রয়েছে বলে ঢাকা ওয়াসার তথ্য থেকে জানা যায়। কিন্তু এসব বৈধ সংযোগ থেকে স্থানীয়ভাবে আবারও বিভিন্ন পরিবারে পানি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
কড়াইলের একজন বাসিন্দা জানান, পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম হলেও মাসে ৩০০ টাকা পানির বিল দিতে হয়। অন্য বাসিন্দাদের ক্ষেত্রেও ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত মাসিক অর্থ নেওয়ার কথা জানা গেছে।
কড়াইলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়াসা কর্মকর্তা নয়ন সরকার বলেন, মিটারযুক্ত লাইন থেকে পানি নেওয়ার জন্য অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কথা নয়। তবে কিছু সংযোগধারী অবৈধভাবে পানি সরবরাহ করে এটিকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করেছেন বলে স্বীকার করেন তিনি।
ডেসকোর পরিচালনা বিভাগের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাশেদুর রহমান বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সব পরিবারের জন্য মিটার স্থাপনের কাজ চলছে। প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ হলেও এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদ সালমা এ শফির মতে, বস্তিবাসীকে দীর্ঘদিন অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে রাখার কারণে সমস্যাটি জটিল হয়েছে। তার মতে, নিম্ন আয়ের এসব মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি বৈধ ইউটিলিটি সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, বস্তির জনসংখ্যা বাড়লেও মৌলিক সেবা ব্যবস্থাপনায় কর্তৃপক্ষের নজরদারি একইভাবে বাড়েনি। ফলে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে স্থায়ী কাঠামোর রূপ নিয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম শফিকুজ্জামান বলেন, সরকারি সরবরাহব্যবস্থা থেকে সেবা পাওয়ার পরও বস্তিবাসীকে মধ্যস্বত্বভোগীদের অর্থ দিতে হচ্ছে, এটি ভোক্তা অধিকার ও সুশাসন, দুই দিক থেকেই উদ্বেগের বিষয়।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সামাজিক ও বস্তি উন্নয়ন বিভাগের প্রধান মোহাম্মদ মামুন উল হাসান জানিয়েছেন, বর্তমানে বস্তির পরিবারগুলোকে নতুন ইউটিলিটি সংযোগ দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা ডিএনসিসির নেই। সরকার এ বিষয়ে নীতি বা আইনি কাঠামো তৈরি করলে সিটি করপোরেশন তা অনুসরণ করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বস্তিকে শহরের বাইরে থাকা কোনো বিচ্ছিন্ন জনপদ হিসেবে না দেখে নগর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসের বৈধ ও সাশ্রয়ী সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে একদিকে বস্তিবাসীর অতিরিক্ত ব্যয় কমবে, অন্যদিকে অবৈধ সরবরাহব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতাও কমবে।
সবচেয়ে বড় বিষয়, একটি সরকারি মিটারের বিদ্যুৎ বা একটি বৈধ পানির সংযোগ যখন বহু পরিবারের কাছে পৌঁছায়, তখন সেই সেবার মূল্য নির্ধারণ ও অর্থ আদায়ের পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ না হলে সরকারি সেবার সুফল শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘরে পৌঁছায় না। বস্তিবাসীর অতিরিক্ত ব্যয়ের মূল জায়গাটিও সেখানেই।


