Homeবিবিধধর্মবাবার হাত ধরেই যে কন্যা জান্নাতের পথে হাঁটে

বাবার হাত ধরেই যে কন্যা জান্নাতের পথে হাঁটে

নিজস্ব প্রতিনিধি:

কিছু কান্না শুধু কান্না নয়। কিছু অশ্রু শব্দের চেয়েও শক্তিশালী। আর কিছু ছোট্ট হাত যখন অসহায় বাবার দিকে বাড়িয়ে বলে, ‘আমার বাবাকে ছেড়ে দাও’, তখন সেই দৃশ্য কেবল একটি পরিবারের বেদনা হয়ে থাকে না; তা মানুষের হৃদয়ে কন্যাসন্তানের ভালোবাসার এক গভীর ছবি এঁকে যায়।

সম্প্রতি বরিশালের উজিরপুরে এমনই একটি দৃশ্য মানুষকে নাড়া দিয়েছে। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী তুবা ছুটে গিয়েছিল তার বাবার কাছে। চুরির অভিযোগে তার বাবা অনিক সরদারকে বেঁধে মারধর করা হচ্ছে, এমন খবর পেয়ে ছোট্ট মেয়েটি সেখানে গিয়ে বাবার অসহায় অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। কাঁদতে কাঁদতে তার আকুতি ছিল, ‘আমার বাবাকে আর মাইরো না, আমার বাবাকে ছেড়ে দাও। আমার বাবা ভালো বাবা।’

একটি শিশুর মুখের এই কয়েকটি বাক্য হয়তো কোনো বড় বক্তৃতা নয়। কিন্তু একজন বাবার জন্য এর চেয়ে বড় আশ্রয়ের ভাষা আর কী হতে পারে?

কন্যাসন্তানের সৌন্দর্য এখানেই, সে অনেক সময় বাবার কষ্ট বুঝতে শেখে ভাষা শেখারও আগে। বাবার ক্লান্ত মুখে তার হাসি যেমন স্বস্তি আনে, তেমনি বাবার চোখের পানি তার নিজের চোখেও অশ্রু হয়ে নামে।

ইসলাম কন্যাসন্তানকে কখনো বোঝা হিসেবে দেখেনি। বরং যে সমাজে কন্যাশিশুর জন্মকে একসময় লজ্জা ও অপমান হিসেবে দেখা হতো, কোরআন সেই অমানবিক মানসিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের কাউকে কন্যাসন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হয়, তখন তার মুখ কালো হয়ে যায় এবং সে দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়।’ (সুরা আন-নাহল : ৫৮)

এই আয়াত শুধু একটি সময়ের মানুষের মানসিকতার বর্ণনা নয়; এটি আমাদের জন্যও একটি সতর্কবার্তা। কন্যার জন্মে মন খারাপ করা, তাকে পরিবারের বোঝা ভাবা কিংবা তার ভবিষ্যৎকে ছেলের তুলনায় কম মূল্যবান মনে করা, ইসলামের দৃষ্টিতে এ মানসিকতার কোনো স্থান নেই।

বরং নবীজি (সা.) কন্যাদের প্রতি দায়িত্বশীলতা ও উত্তম আচরণকে অত্যন্ত মর্যাদার বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কন্যাদের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করবে, তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে ঢাল হবে।’ (বুখারি : ৫৯৯৫)

অর্থাৎ কন্যা শুধু বাবার ঘরের অতিথি নয়। সে বাবার দায়িত্বেরও অংশ, আবার আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক আমানতও।

একটি কন্যাকে মানুষ করা মানে একটি প্রজন্মকে তৈরি করা

কন্যাকে ভালোবাসা সহজ। কিন্তু তাকে সঠিকভাবে মানুষ করা কঠিন।

তার হাতে শুধু খেলনা তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। তাকে শেখাতে হয় ঈমান, হায়া, আদব, সত্যবাদিতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধ। তাকে বুঝতে শেখাতে হয়—মানুষের প্রতি দয়া দুর্বলতা নয়; বরং চরিত্রের শক্তি।

একজন বাবা যখন মেয়ের মাথায় হাত রেখে তাকে নামাজ শেখান, কোরআনের আয়াত শেখান, সত্য কথা বলতে উৎসাহ দেন, মানুষের প্রতি সম্মান করতে শেখান—তখন তিনি শুধু নিজের মেয়েকে গড়ে তুলছেন না। তিনি ভবিষ্যতের একজন মা, একজন শিক্ষিকা এবং একটি পরিবারের নৈতিক ভিত্তি তৈরি করছেন।

আজ যে কন্যা বাবার পাশে বসে কোরআন শেখে, কাল সে হয়তো নিজের সন্তানকে সেই শিক্ষা দেবে। আজ যে মেয়ে বাবার অসুস্থতায় ওষুধ এগিয়ে দেয়, কাল সে হয়তো নিজের সন্তানকে বাবার প্রতি দায়িত্বশীল হতে শেখাবে।

একটি মেয়ের চরিত্র তাই একটি পরিবারের সীমানায় থেমে থাকে না। তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

বাবার জন্য মেয়ের ভালোবাসা

বাবা অনেক সময় সংসারের সবচেয়ে নীরব মানুষটি। তিনি নিজের কষ্টের কথা বলেন না। সন্তানদের মুখের হাসির জন্য নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু সেই নীরব মানুষটির কষ্ট সবচেয়ে আগে বুঝে ফেলে যে ছোট্ট মেয়েটি তার পাশে বসে থাকে।

তুবার ঘটনাটি তাই এত গভীরভাবে নাড়া দেয়।

সে কোনো আইনি ভাষা জানে না। জানে না অভিযোগ কী, বিচার কী, প্রশাসন কী। সে শুধু জানে, ওই মানুষটি তার বাবা। তাই বাবাকে যখন আঘাত করা হচ্ছিল, তার শিশুমন প্রতিবাদ করেছে। তার কাছে বাবার পরিচয়ই ছিল সবচেয়ে বড় সত্য।

এই ভালোবাসা তৈরি হয় এক দিনে নয়। একজন বাবা যখন মেয়েকে সময় দেন, তার কথা শোনেন, তাকে সম্মান করেন, নিরাপত্তা দেন এবং ভালোবাসা দিয়ে বড় করেন—তখন মেয়ের হৃদয়ে বাবার জন্য এমনই এক গভীর আস্থা জন্ম নেয়।

রহমতের দরজা, কিন্তু দায়িত্বও

কন্যাসন্তানকে ‘রহমতের দরজা’ বলা হয়। তবে এই রহমত শুধু আবেগের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দায়িত্ব।

একজন বাবা যদি মেয়েকে শিক্ষার সুযোগ না দেন, তার মতামতকে মূল্য না দেন, তাকে নিরাপদ পরিবেশ না দেন, আবার শুধু কন্যা হওয়ার কারণে তাকে অবহেলা করেন, তাহলে কন্যার মর্যাদা নিয়ে কথা বলা অর্থহীন।

ইসলাম কন্যার অধিকার যেমন দিয়েছে, তেমনি বাবার ওপর তার লালন-পালনের দায়িত্বও দিয়েছে।

তাই কন্যার জন্মের পর শুধু ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বললেই হবে না। সেই আলহামদুলিল্লাহর দাবি পূরণ করতে হবে দায়িত্বের মাধ্যমে। তাকে ভালো শিক্ষা দিতে হবে, চরিত্রবান করে গড়ে তুলতে হবে, দ্বীনের জ্ঞান দিতে হবে, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর যোগ্য করে তুলতে হবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে এমন মানুষ করতে হবে, যার উপস্থিতিতে পরিবার নিরাপদ ও আলোকিত বোধ করে।

তুবার অশ্রুর কাছে আমাদের শিক্ষা

উজিরপুরের ছোট্ট তুবার কান্না হয়তো কয়েক দিনের মধ্যে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে। কিন্তু তার সেই একটি বাক্য, ‘আমার বাবা ভালো বাবা’, একটি বড় সত্য মনে করিয়ে দেয়।

সন্তানের কাছে বাবা-মা শুধু অভিভাবক নন; তারা তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।

আর কন্যাসন্তানের ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক অনেক সময় এক অনন্য কোমলতায় প্রকাশ পায়। বাবার কষ্টে মেয়ের চোখ ভিজে যায়, বাবার হাসিতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

তাই কন্যাকে বোঝা নয়, আমানত হিসেবে দেখতে হবে। তাকে করুণা নয়, মর্যাদা দিতে হবে। তাকে শুধু বিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, মানুষ হওয়ার জন্য বড় করতে হবে।

কারণ আজকের সেই ছোট্ট মেয়েটিই একদিন কারও মা হবে। তার হাতেই তৈরি হবে আরেকটি প্রজন্মের চরিত্র।

একজন বাবা হয়তো ভাবছেন, তিনি শুধু তার মেয়েকে বড় করছেন। অথচ আল্লাহর পরিকল্পনায় তিনি হয়তো একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম কিংবা একটি সমাজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলছেন।

কন্যার হাত ধরে তাই শুধু ঘরে আসে না মায়া; আসে দায়িত্ব, ভালোবাসা এবং সম্ভাবনার এক নতুন অধ্যায়।

আর যে বাবা সেই কন্যাকে ঈমান, ইলম, হায়া, আদব ও মানবিকতার আলোয় বড় করে তোলেন, তার জন্য সেই সন্তান দুনিয়ার শান্তির কারণ হওয়ার পাশাপাশি আখিরাতের সওয়াবেরও একটি সম্ভাব্য দরজা হয়ে উঠতে পারে।

কন্যা তাই শুধু বাবার ঘরের একটি সন্তান নয়, সে বাবার হৃদয়ে রাখা এক আমানত, আর সঠিকভাবে গড়ে উঠলে সেই আমানতই হতে পারে রহমতের এক অপার দরজা।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments