তানভীর রায়হান
একটি লোকোমোটিভ বিকল হলে সেটি মেরামত করে দ্রুত লাইনে ফেরানোই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানায় অনেক ক্ষেত্রে মেরামতের অর্থ দাঁড়িয়েছে, একটি অচল ইঞ্জিন থেকে যন্ত্রাংশ খুলে আরেকটি সচল করা। প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস না থাকায় এমন ‘কুইক ফিক্স’ করে ইঞ্জিন লাইনে পাঠানোর পর আবারও একই ত্রুটি নিয়ে সেটি ফিরে আসছে কারখানায়। ফলে তৈরি হচ্ছে ‘রিপিট ফেইলিওর’-এর চক্র।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের মিটারগেজ লোকোমোটিভ মেরামতের অন্যতম প্রধান এই কারখানায় অনুমোদিত ৩৩০টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ১১০ জন। অর্থাৎ ২২০টি পদই শূন্য। দীর্ঘদিন নিয়োগ না হওয়া, অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানদের অবসর এবং আমদানিনির্ভর স্পেয়ার পার্টসের সংকট মিলিয়ে কারখানাটির ওপর তৈরি হয়েছে বহুমুখী চাপ।
কারখানা-সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কোনো যন্ত্রাংশের চাহিদাপত্র দেওয়ার পর প্রশাসনিক অনুমোদন, বাজেট বরাদ্দ, ক্রয়প্রক্রিয়া ও ঋণপত্র (এলসি) সংক্রান্ত বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে সেটি হাতে পেতে কখনো এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায়। এ কারণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ না পাওয়া পর্যন্ত অনেক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানায় পড়ে থাকে।
অন্যদিকে ট্রেন পরিচালনা সচল রাখতে দ্রুত ইঞ্জিন লাইনে ফেরানোর চাপ রয়েছে। ফলে সব প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ হাতে না থাকলেও অনেক সময় সাময়িক সমাধানের মাধ্যমে লোকোমোটিভ চালু করা হয়। সংশ্লিষ্টদের ভাষায়, এ ধরনের মেরামত তাৎক্ষণিকভাবে কাজে এলেও দীর্ঘমেয়াদে সমস্যার সমাধান হয় না।
কারখানার শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টসের সংকটের কারণে অচল লোকোমোটিভের যন্ত্রাংশ খুলে সচল করার প্রবণতা এখন নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। এতে একটি ইঞ্জিন দ্রুত লাইনে ফেরানো গেলেও অন্য একটি ইঞ্জিন মেরামতের বাইরে থেকে যায়।
সমস্যা আরও বাড়ে যখন সাময়িকভাবে মেরামত করা ইঞ্জিন আবার একই ত্রুটি নিয়ে কারখানায় ফিরে আসে। এতে একটি লোকোমোটিভের মেরামতের কাজ বারবার করতে হয়। একদিকে কারখানার কর্মীদের ওপর বাড়ে কাজের চাপ, অন্যদিকে কমে যায় প্রস্তুত লোকোমোটিভের সংখ্যা।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ট্রেন পরিচালনায়। পর্যাপ্ত লোকোমোটিভ প্রস্তুত না থাকলে নির্ধারিত সময়ে ট্রেন পরিচালনা, অতিরিক্ত ট্রেন সংযোজন এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় রেলওয়েকে চাপের মধ্যে পড়তে হয়।
পাহাড়তলী ডিজেল শপের সংকটের অন্যতম বড় কারণ জনবল ঘাটতি। ৩৩০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত ১১০ জন। ফলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পদই শূন্য।
বিশেষ করে অভিজ্ঞ মেকানিক ও টেকনিশিয়ানদের ঘাটতি মেরামতকাজে বড় বাধা তৈরি করছে। পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভের বিভিন্ন যান্ত্রিক ও বৈদ্যুতিক ত্রুটি নির্ণয় এবং ওভারহোলিংয়ের জন্য দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কারিগরি কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু অভিজ্ঞ কর্মীদের অবসরের পর সেই ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় বিদ্যমান কর্মীদের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।
কোথাও কোথাও দৈনিক মজুরি ও অদক্ষ শ্রমিকের সহায়তা নিতে হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে জটিল কারিগরি কাজের ক্ষেত্রে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবলের বিকল্প নেই বলে মনে করেন তারা।
সংকটের মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কাজের সক্ষমতা রয়েছে। গত চার অর্থবছরে কারখানাটি ১৫টি মৃতপ্রায় ও চারটি দুর্ঘটনাকবলিত, মোট ১৯টি লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠিয়েছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে চারটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চারটি এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাঁচটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
এ ছাড়া গত তিন-চার বছরে প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আটটি লোকোমোটিভের মেরামত ও লাইট ওভারহোলিং করা হয়েছে। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে বাড়তি ট্রেন পরিচালনার জন্য একসঙ্গে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ প্রস্তুত করার চাপও সামলাতে হয়েছে কারখানাটিকে।
দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আমদানি করা ৩০০০ সিরিজের ২২টি আধুনিক লোকোমোটিভও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে এই কারখানায় মেরামত করা হয়েছে।
জনবল সংকট সামাল দিতে এবং মেরামতের সময় কমাতে কারখানায় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিকস এবং পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিং অটোমেশন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে।
ডায়াগনস্টিকস মেশিনের মাধ্যমে ইলেকট্রিক্যাল ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা যায়। অন্যদিকে সিলিন্ডার হেড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টসহ ভারী যন্ত্রাংশ পরিষ্কার ও ফিটিংয়ের কাজও তুলনামূলক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে করা সম্ভব হচ্ছে।
এ ছাড়া দেশীয় প্রযুক্তিতে জিব ক্রেন, এসি মোটর টেস্টিং প্ল্যান্ট ও কমপ্রেসর টেস্টিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা হয়েছে।
তবে প্রযুক্তি যুক্ত হলেও প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস সময়মতো না এলে এসব সুবিধার পূর্ণ ব্যবহার সম্ভব হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি থাকায় মেরামতকাজ চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। দক্ষ জনবলের ঘাটতি মোকাবিলা ও কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের জন্য পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধরনের অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে পাওয়া প্ল্যান্ট ও মেশিনারিজের পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে ডায়াগনস্টিক প্ল্যান্টও স্থাপন করা হচ্ছে। তবে এসব ব্যবস্থা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অপ্রতুল। সরঞ্জাম বিভাগ বাজেট ও এলসি জটিলতা কাটিয়ে আমদানি করা মালামাল দ্রুত সরবরাহ করতে পারলে কারখানার কাজের গতি এবং লোকোমোটিভ সচল করার হার আরও বাড়বে।
কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়তলী ডিজেল শপের সংকট মোকাবিলায় শুধু নতুন মেশিন স্থাপন করলেই হবে না। একই সঙ্গে শূন্য পদে দক্ষ জনবল নিয়োগ, অভিজ্ঞ কারিগরদের জ্ঞান নতুন কর্মীদের মধ্যে স্থানান্তর, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং সময়মতো বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস সময়মতো সংগ্রহ ও সরবরাহ করা। কারণ একটি লোকোমোটিভ সাময়িকভাবে সচল করে লাইনে পাঠানো গেলেও নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ ও পূর্ণাঙ্গ ওভারহোলিং ছাড়া সেটি দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরযোগ্য রাখা কঠিন।
একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হলে ক্ষতি শুধু ওই ইঞ্জিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। কমে যায় রেলের কার্যকর লোকোমোটিভ বহর, বাড়ে কারখানার মেরামত চাপ এবং ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয় ট্রেন পরিচালনায়।
তাই এক অচল ইঞ্জিনের পার্টস খুলে আরেকটি সচল করার সাময়িক সমাধানের বদলে সময়মতো স্পেয়ার পার্টস সরবরাহ, নির্ধারিত ওভারহোলিং এবং দক্ষ জনবল নিশ্চিত করাই পাহাড়তলী ডিজেল শপের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা ফেরানোর প্রধান শর্ত।


