তানভীর রায়হান:
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রের ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর ও শক্তিশালী করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব বলে মনে করেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন। তাঁর দাবি, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের মধ্যেই দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন, নগর ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফেরানো এবং সাধারণ মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিস্তারে সরকার কাজ করছে।
তবে তাঁর মতে, দীর্ঘদিনের ক্ষত সারিয়ে রাষ্ট্রকে একটি কার্যকর কাঠামোর মধ্যে ফিরিয়ে আনতে সময় প্রয়োজন। পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া খাল, ফুটপাতের হকার, আইনশৃঙ্খলা, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জুলাই আন্দোলনে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়েও কথা বলেছেন তিনি।
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন তানভীর আহমেদ রবিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিবেদক তানভীর রায়হান।
‘পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বড় কাজ প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানো’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের পরিস্থিতিকে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
তানভীর আহমেদ রবিন: ৫ আগস্টের আগে দেশে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবেশ ছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসতে ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আন্দোলন করেছে। সেই পরিবর্তনের পর মানুষের প্রধান প্রত্যাশা ছিল আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা।
আমার দৃষ্টিতে, দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রের অনেক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে। তাই শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইনের প্রয়োগকে শক্তিশালী করাও জরুরি।
বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের মধ্যে আমরা সেই প্রক্রিয়ার শুরু দেখতে পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনায় যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর করার যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
‘জুলাই চেতনা রাজনৈতিক ব্যবসার বিষয় নয়’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের চেতনাকে বিএনপি কীভাবে বাস্তবায়ন করছে?
তানভীর আহমেদ রবিন: জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন ও জবাবদিহিমূলক একটি রাষ্ট্র। বিএনপি সেই চেতনাকে ধারণ করে। দলটি জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং যেসব বিষয়ে দ্বিমত রয়েছে, সেগুলোও পরিষ্কারভাবে জানিয়েছে।
আমরা মনে করি, জুলাই চেতনা কোনো রাজনৈতিক ব্যবসার বিষয় নয়। যারা সেই আন্দোলনে অংশ নিয়েছে, তাদের প্রত্যাশা ছিল মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন। সে কারণেই ক্ষমতায় এসে জনগণের জন্য বাস্তব কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, বৃক্ষরোপণ এবং খাল পুনরুদ্ধারের মতো উদ্যোগগুলোকে আমরা সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে দেখছি।
‘সাত মাসে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা অনেক। আপনারা কীভাবে বিষয়টি দেখছেন?
তানভীর আহমেদ রবিন: সরকার দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র সাত মাস আগে। এত অল্প সময়ে সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। তবে কাজ শুরু হয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় খাল খনন ও পুনরুদ্ধারের কাজ হচ্ছে। আমরা তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি এবং সরকারি কর্মসূচিগুলো সম্পর্কে তাদের জানাচ্ছি।
সরকারের প্রতিটি কর্মসূচি যেন প্রকৃত সুবিধাভোগীর কাছে পৌঁছায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য সঠিক তালিকা তৈরি ও স্থানীয় পর্যায়ে নজরদারি প্রয়োজন।
‘খাল বাঁচাতে শুধু খনন নয়, সীমানাও রক্ষা করতে হবে’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: পুরান ঢাকার খাল ও জলাবদ্ধতা নিয়ে আপনারা কী ধরনের পরিবর্তন চান?
তানভীর আহমেদ রবিন: ঢাকার অনেক খাল সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গেছে। কোথাও স্থাপনা হয়েছে, কোথাও রাস্তা তৈরি হয়েছে, আবার কোথাও খালের পানি পাইপের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখন যেসব খাল রয়েছে, সেগুলোকে অন্তত রক্ষা করতে হবে।
প্রথম কাজ হওয়া উচিত খালের সীমানা নির্ধারণ। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী দুই পাশে রিটেইনিং ওয়াল, হাঁটার পথ, রাস্তা, আলো ও ফেন্সিং করা যেতে পারে।
তবে অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। মানুষ যদি খালে প্লাস্টিক ও আবর্জনা ফেলে, তাহলে পানিপ্রবাহ আবার বন্ধ হয়ে যাবে। তাই খাল রক্ষার সঙ্গে নাগরিক সচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।
‘হকারদের উচ্ছেদ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে হকার উচ্ছেদ কতটা কার্যকর বলে মনে করেন?
তানভীর আহমেদ রবিন: নগরবাসী সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে। মানুষের চলাচলের জায়গা অবশ্যই মানুষের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে।
কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও দেখতে হবে। হকারদের বড় একটি অংশ নিম্ন আয়ের মানুষ। তাদের উচ্ছেদ করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। বিকল্প ব্যবসার জায়গা বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
তা না হলে উচ্ছেদের পর তারা আবার ফিরে আসবে। প্রশাসন যাবে, উচ্ছেদ করবে; প্রশাসন চলে গেলে তারা আবার বসবে—এভাবে দীর্ঘদিন চলতে পারে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থানের পরিকল্পনা দরকার।
‘রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার প্রয়োজন হলে বিএনপি প্রস্তুত’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বিএনপির অবস্থান কী?
তানভীর আহমেদ রবিন: বিএনপি সবসময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করেছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ। তাদের বিষয়ে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।
তবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রয়োজন হলে বিএনপি তার জন্য প্রস্তুত। আমাদের মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রে আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রতিষ্ঠা করা।
‘অর্থনীতি ও প্রতিষ্ঠান, দুই দিকেই চ্যালেঞ্জ’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী?
তানভীর আহমেদ রবিন: চ্যালেঞ্জ অনেক। অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতেও নানা সমস্যা রয়েছে।
এর পাশাপাশি জনগণের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। নির্বাচনী ইশতেহারে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। শুধু সরকার বা রাজনৈতিক দলের একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
‘এক কাপড়ে ছয়-সাত দিন কাটিয়েছি’
সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ: জুলাই আন্দোলনের সময় আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?
তানভীর আহমেদ রবিন: জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন, কৃতিত্ব তাদের। আমরা যারা রাজপথে ছিলাম, আল্লাহ আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছেন।
সেই সময় আমাদের হন্যে হয়ে খোঁজা হয়েছে। দিনের পর দিন আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। কখনো এক কাপড়ে ছয়-সাত দিন কাটিয়েছি। নিরাপত্তার কারণে দিনে কয়েকবার মোবাইল ফোন পরিবর্তন করতে হয়েছে। কোথাও যাওয়ার পর পরবর্তী গন্তব্য কোথায় হবে, সেটিও অনেক সময় জানতাম না।
আমাদের নেতাকর্মী ছাড়াও এলাকার সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অনেকে আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের ত্যাগকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে হবে।
৫ আগস্টের পরিবর্তন কোনো একক ব্যক্তি বা দলের কারণে হয়নি। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা একসঙ্গে রাজপথে ছিলেন বলেই সেই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। যারা জীবন দিয়েছেন ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, এই পরিবর্তনের কৃতিত্ব মূলত তাদের।


