Homeবিবিধঅপরাধঅনলাইন জুয়ার বিস্তার, দেশের অন্তত ৮ এলাকায় সক্রিয় হাব

অনলাইন জুয়ার বিস্তার, দেশের অন্তত ৮ এলাকায় সক্রিয় হাব

এজেন্ট-সুপার এজেন্টের নেটওয়ার্কে চলছে লেনদেন; বিদেশে থাকা নিয়ন্ত্রকদের কাছে যাচ্ছে অর্থ, নজরদারিতে মোবাইল ব্যাংকিং

আহমেদ খান:

দেশে অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে এজেন্ট ও সুপার এজেন্টভিত্তিক নেটওয়ার্ক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও তদন্তে মেহেরপুরের মুজিবনগর, নড়াইলের কালিয়া, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কুড়িগ্রামের রৌমারী-ভূরুঙ্গামারী, নরসিংদীর মাধবদী, নাটোরের লালপুর, গাজীপুরের টঙ্গী ও কক্সবাজার সদরের মতো এলাকায় অনলাইন জুয়ার কার্যক্রমের তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এসব নেটওয়ার্কের সঙ্গে দেশের বাইরে থাকা ব্যক্তিদের যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া গেছে। চীন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের সঙ্গে স্থানীয় এজেন্টদের যোগাযোগ থাকার তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে। তবে এসব এলাকার প্রতিটি নেটওয়ার্কের মূল নিয়ন্ত্রক কারা, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য বা নির্ভরযোগ্য তালিকা এখনো তৈরি হয়নি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অভিযানে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের অধিকাংশই এজেন্ট বা ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ের। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ডিভাইস পরীক্ষা করে টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের তথ্য পাওয়া গেছে। বিদেশে থাকা ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কখনো কখনো বিদেশি ভাষাও ব্যবহার করা হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্টদের মতে, অনলাইন জুয়ার অর্থ লেনদেনে মোবাইল ব্যাংকিং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। স্থানীয় এজেন্টের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহের পর তা একাধিক ধাপে অন্যদের কাছে পৌঁছায়। পরে হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে দেশের বাইরে অর্থ পাঠানোর অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ছাড়া নির্দিষ্ট অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করা কঠিন।

মেহেরপুরের মুজিবনগরকে অনলাইন জুয়ার অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে উল্লেখ করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। স্থানীয়ভাবে দীর্ঘদিন ধরে এখানে অনলাইন জুয়ার বিস্তারের কথা বলা হলেও কারা এর মূল পৃষ্ঠপোষক বা নিয়ন্ত্রক, তা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের বিরুদ্ধেও পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী ও রৌমারী এবং নড়াইলের কালিয়াতেও বিভিন্ন সময়ে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। একইভাবে মাধবদী, টঙ্গী ও লালপুর থেকেও এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তারের তথ্য রয়েছে।

কক্সবাজারে অনলাইন জুয়া ও অনলাইন প্রতারণার অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের সংশ্লিষ্টতার ঘটনাও সামনে এসেছে। গত সেপ্টেম্বরে দুটি হোটেলে অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক আইফোন ও ল্যাপটপ জব্দের কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব ডিভাইস ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ তদন্ত করা হচ্ছে।

এদিকে অনলাইন জুয়ার বাজার কত বড়, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে ৫০ লাখের বেশি মানুষ অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ে জড়িত বা আসক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের একটি বড় অংশ তরুণ ও যুবক। সমীক্ষায় অনলাইন জুয়ার বাজারের আকার কয়েক কোটি ডলার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত শত শত ওয়েবসাইট ও অ্যাপ শনাক্ত করে সেগুলো বন্ধের জন্য বিটিআরসিকে অনুরোধ করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরও বিভিন্ন সময়ে জুয়ার সাইট শনাক্ত করে বন্ধের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, একটি সাইট বন্ধ হওয়ার পর সামান্য পরিবর্তন এনে নতুন ঠিকানায় একই ধরনের কার্যক্রম চালু করা হচ্ছে। ফলে শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করে স্থায়ীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনলাইন জুয়ার এজেন্ট ও সুপার এজেন্ট থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।

তার মতে, অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অস্বাভাবিক লেনদেনের ওপর নজরদারি বাড়ানো জরুরি। কোনো অ্যাকাউন্টে অস্বাভাবিক লেনদেন দেখা গেলে দ্রুত তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, অনলাইন জুয়া শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদে এটি পরিবার, তরুণ সমাজ ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শুধু গ্রেপ্তার বা ওয়েবসাইট বন্ধের পাশাপাশি আর্থিক লেনদেনের পথ বন্ধ করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং তরুণদের মধ্যে জুয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও প্রয়োজন।

অনলাইন জুয়ার বিস্তার ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত নজরদারিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments