Homeঅর্থনীতিজাপানের বাজার ধরতে মান, সনদ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

জাপানের বাজার ধরতে মান, সনদ ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ

ইপিএ কার্যকর হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১২–১৩ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা

রায়হান আহমেদ:

জাপানের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে তৈরি পোশাকের বাইরে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক পণ্য এবং ওষুধশিল্পের মতো সম্ভাবনাময় খাতে গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, প্রয়োজনীয় সনদ অর্জন এবং উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকর হলে নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সুবিধা কাজে লাগাতে দেশের উদ্যোক্তাদের এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।

জাপান-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সেক্রেটারি জেনারেল ও এমকেকে লজিস্টিকসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রবিউল আলম এসব কথা বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফর, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ এবং ইপিএর সম্ভাবনা নিয়ে সিএনএস টুয়েন্টি ফোর নিউজ ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ অভিমত তুলে ধরেন।

রবিউল আলমের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বছরে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হয়। ইপিএ কার্যকর হলে আগামী কয়েক বছরে এই পরিমাণ দ্বিগুণ বা তিন গুণ হয়ে ১২ থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এ লক্ষ্য অর্জন নির্ভর করবে চুক্তির সুবিধা ব্যবহার, পণ্যের মান নিশ্চিত করা এবং রপ্তানি সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর।

আগামী ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ঘিরে ব্যবসায়ী মহলে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে বলে জানান রবিউল আলম। তাঁর আশা, সফরে বাংলাদেশে জাপানের সহযোগিতায় বাস্তবায়নাধীন অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ এবং দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হবে।

মেট্রোরেল, মাতারবাড়ী প্রকল্পের টার্মিনাল এবং বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পে জাপান সরকার ও দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ইপিএ স্বাক্ষরকে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন এই ব্যবসায়ী নেতা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি দুই দেশের সরকারের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে অনুমোদনপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হতে পারে বলে তিনি আশা করছেন।

বাংলাদেশের রপ্তানি এখনো তৈরি পোশাকশিল্পের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কমিয়ে নতুন খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন রবিউল আলম।

তিনি বলেন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কৃষি ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক পণ্য এবং ওষুধশিল্পে বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব খাতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি জাপানের বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরি করতে হবে।

তবে জাপানের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে পণ্যের গুণগত মান, খাদ্যনিরাপত্তা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক সনদ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৃষি ও প্রাণিসম্পদভিত্তিক পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিকারক দেশের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে শুল্কসুবিধা থাকলেও রপ্তানি বাড়ানো কঠিন হবে।

রবিউল আলমের মতে, ইপিএর আওতায় সাত হাজারের বেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে কোন পণ্য কী শর্তে সুবিধা পাবে, তা চুক্তির বিস্তারিত বিধান পর্যালোচনা করে নিশ্চিত হতে হবে। বাংলাদেশের বিদ্যমান বাণিজ্যিক সুবিধা এবং ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও প্রশাসনিক জটিলতা, দীর্ঘ অনুমোদনপ্রক্রিয়া এবং বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেছেন রবিউল আলম।

তাঁর মতে, একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চালু করতে বিভিন্ন অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে বিনিয়োগকারীদের সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। এ ছাড়া কাস্টমসের ছাড়পত্রসহ আমদানি-রপ্তানির বিভিন্ন ধাপে দীর্ঘসূত্রতা ব্যবসার খরচ বাড়ায়।

বিনিয়োগকারীদের জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিসসহ সরকারের নেওয়া উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, শুধু নতুন নীতি বা সেবা চালু করলেই হবে না; বিনিয়োগকারীরা যাতে দ্রুত ও সহজে প্রয়োজনীয় সেবা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে।

রবিউল আলম জানান, তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশে জাপানের সর্বোচ্চ বিনিয়োগ ছিল প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ইপিএ কার্যকর হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হওয়ার পাশাপাশি জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ আগ্রহ বাড়তে পারে বলে তিনি আশা করছেন।

ইপিএর সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উদ্যোক্তাদের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, প্রয়োজনীয় সনদ অর্জন এবং বাজারের চাহিদা বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনা, কাস্টমস প্রক্রিয়া ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন প্রয়োজন।

রবিউল আলম বলেন, ইপিএ স্বাক্ষরের আগে প্রায় দুই বছর ধরে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। এ সময় জাপান-বাংলাদেশ চেম্বারের পক্ষ থেকে চুক্তির সম্ভাব্য সুবিধা, অগ্রাধিকার ও করণীয় নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ সরকার ও জাপানি দূতাবাসে জমা দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, চেম্বারটি আলোচনা, সেমিনার ও কর্মশালার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে। চুক্তির পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রকাশিত হলে সম্ভাবনাময় খাতগুলো চিহ্নিত করে রপ্তানি বাড়ানোর বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন ও চুক্তির বিস্তারিত শর্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশের করণীয় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ, শুল্কমুক্ত সুবিধা নিজে থেকেই রপ্তানি বাড়ায় না। মানসম্পন্ন পণ্য, প্রতিযোগিতামূলক উৎপাদন, কার্যকর সরবরাহব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের শর্ত পূরণের সক্ষমতাই নির্ধারণ করবে জাপানের বাজারে বাংলাদেশ কতটা এগোতে পারবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments