ড. মুহম্মদ ইদ্রিছ ভুইয়া:
বর্তমান সৌদি আরব মুসলিম পরিচয়ধারী একটি রাষ্ট্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের ধর্মীয় পরিচয় আর তার শাসনব্যবস্থার মানবিক মূল্যবোধ কি একই বিষয়? আমার দৃষ্টিতে, সৌদি রাজতন্ত্রের ক্ষমতা ও আচরণের সঙ্গে ইসলামের সাম্য, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার আদর্শের গভীর বিরোধ রয়েছে।
মক্কায় গেলেই কি আল্লাহকে পাওয়া যায়? মদিনায় গেলেই কি নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে হৃদয়ে অনুভব করা যায়? শুধু পবিত্র স্থানে উপস্থিত হওয়া কিংবা ধর্মীয় স্থাপনার জাঁকজমক দেখা কি আত্মিক উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট? আমার বিশ্বাস, এর উত্তর খুঁজতে হবে মানুষের বিবেক, বিশ্বাস ও জীবনাচরণের মধ্যে।
লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোর নামকরণে রাজপরিবারের সদস্যদের পরিচয় বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। অথচ ইসলামের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ নবী, খলিফা কিংবা সাহাবিদের নামে বিমানবন্দর রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তোলা যেতে পারে। যে ধর্মীয় ঐতিহ্য ও আদর্শের ওপর মুসলিম সমাজের পরিচয় গড়ে উঠেছে, তার প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের ধরন নিয়েও আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের শাসকগোষ্ঠী মক্কা ও মদিনার খাদেম বা সেবক হওয়ার পরিচয়কে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পবিত্র দুই নগরীর সেবার দাবি কি কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, সম্প্রসারণ ও ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ? নাকি এর সঙ্গে ন্যায়বিচার, মানবিকতা, মানুষের মর্যাদা রক্ষা এবং নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও জড়িত?
ইয়েমেনের যুদ্ধ এবং সেখানে বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ সৌদি আরবের আঞ্চলিক নীতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। যুদ্ধের ফলে অসংখ্য শিশু, নারী ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন; ধ্বংস হয়েছে ঘরবাড়ি, হাসপাতাল ও মসজিদ। এসব ঘটনার দায়, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ভূমিকা এবং মানবিক বিপর্যয়ের প্রকৃত মাত্রা নিয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা হওয়া জরুরি। ধর্মের নামে পরিচালিত কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডই মানবিক জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
আমার প্রশ্ন, যে শাসনব্যবস্থার কর্মকাণ্ডের কারণে মানুষের জীবন, মর্যাদা ও ধর্মীয় স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই ব্যবস্থার ধর্মীয় বৈধতা কি শুধু পবিত্র নগরী দুটির রক্ষণাবেক্ষণের দাবি দিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব?
মক্কা ও মদিনার সৌন্দর্য, বিশাল মসজিদ, ইট-পাথর-কংক্রিটের স্থাপত্য, ইস্পাতের কাঠামো এবং আলোকসজ্জা মানুষের চোখকে মুগ্ধ করতে পারে। কিন্তু এসবের জৌলুশ কি মানুষের বিবেককে জাগিয়ে তুলতে পারে? ধর্মীয় স্থাপনার বাহ্যিক সৌন্দর্য আর মানুষের অন্তরের পবিত্রতা এক বিষয় নয়।
আমার বিশ্বাস, আল্লাহকে খুঁজতে হয় অন্তরে, আর নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর আদর্শকে ধারণ করতে হয় জীবনে। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা, ন্যায়বিচার, সততা, সাম্য ও মানবিক আচরণের মধ্য দিয়েই ইসলামের সৌন্দর্য প্রকাশ পায়।
দুঃখজনকভাবে, ক্ষমতার দাপট এবং সামাজিক মর্যাদার ভিত্তিতে মানুষকে ছোট করে দেখার প্রবণতা বহু সমাজেই রয়েছে। সৌদি আরবের শাসনব্যবস্থা ও সামাজিক আচরণের সমালোচনা করতে গিয়ে এই প্রশ্নও সামনে আসে—ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে ক্ষমতার বৈষম্য ও মানুষের প্রতি অবমাননাকর আচরণকে কত দিন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করা হবে?
যেখানে মানুষের বিবেক, ন্যায়বোধ ও মানবিকতার অবক্ষয় ঘটে, সেখানে কোনো স্থাপনার পবিত্রতা নিয়ে বড়াই করলেই ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। মসজিদ মানুষের ইবাদতের স্থান; কিন্তু সেই ইবাদতের শিক্ষা যদি মানুষের আচরণে প্রতিফলিত না হয়, তবে ধর্মচর্চার তাৎপর্য নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।
ইসলাম শুধু ইট-পাথরের স্থাপনায় সীমাবদ্ধ নয়। ইসলাম মানুষের হৃদয়ে, বিবেকে এবং ন্যায়নিষ্ঠ আচরণে বেঁচে থাকে। রাজতন্ত্রের দম্ভে নয়, বরং মানুষের মর্যাদা রক্ষা ও মানুষে মানুষে ন্যায়সংগত সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মধ্যেই ইসলামের সাম্যবাদী ও মানবিক শিক্ষা প্রতিফলিত হয়।
তাই আমি অন্ধ আনুগত্যের পরিবর্তে বিবেকের জাগরণ দেখতে চাই। ধর্মীয় কর্তৃত্বের নামে কোনো রাষ্ট্র বা শাসকগোষ্ঠীর একচ্ছত্র আধিপত্য নয়; বরং ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হোক, এটাই প্রত্যাশা।
পরিশেষে বলতে চাই, ইসলাম সৌদি রাজতন্ত্রের সম্পত্তি নয়; ইসলাম বিশ্বমানবতার জন্য একটি নৈতিক ও আত্মিক আলোকবর্তিকা। কোনো রাষ্ট্র, রাজপরিবার কিংবা ক্ষমতাকাঠামো এই আলোকবর্তিকাকে নিজেদের একচ্ছত্র সম্পত্তি হিসেবে দাবি করতে পারে না। ইসলামের প্রকৃত শক্তি রাজকীয় জাঁকজমকে নয়, মানুষের হৃদয়ে; আধিপত্যে নয়, ন্যায়বিচারে; আর অন্ধ আনুগত্যে নয়, জাগ্রত বিবেকে।
-একজন আইনজ্ঞ ও কলামিস্ট
এই উপসম্পাদকীয় লেখাটি ড. মুহম্মদ ইদ্রিছ ভুইয়ার মুক্তমতের বহি:প্রকাশ।



