Homeজাতীয়৪ নতুন বইয়ে বদলাবে শিক্ষাক্রম, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

৪ নতুন বইয়ে বদলাবে শিক্ষাক্রম, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন

খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্ব; শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে চ্যালেঞ্জ

তানভীর রায়হান:

মুখস্থনির্ভর ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখানো, সৃজনশীলতা এবং বাস্তবমুখী দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে চারটি নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামে বইগুলো অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তবে নতুন বই যুক্ত হলেই শিক্ষাব্যবস্থায় প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। খেলাধুলা, সংস্কৃতি, আনন্দভিত্তিক শিক্ষা ও কারিগরি দক্ষতার মতো বিষয়গুলো কার্যকরভাবে শেখাতে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পর্যাপ্ত উপকরণ, উপযুক্ত শ্রেণিকক্ষ ও খেলার মাঠ। পাশাপাশি প্রচলিত পরীক্ষা ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন না এলে নতুন বইয়ের উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) তথ্য অনুযায়ী, নতুন চারটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) অনুমোদনের পর বইগুলো মুদ্রণের পরিকল্পনা রয়েছে। চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি ছাপানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, শিক্ষার মাধ্যমে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরির পাশাপাশি কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোও সরকারের লক্ষ্য।

তবে শিক্ষাবিদদের কাছে বড় প্রশ্ন হলো, এই লক্ষ্যগুলো বাস্তবে অর্জনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত। বিশেষ করে দেশের অনেক বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নেই, ক্রীড়াসামগ্রী ও ব্যবহারিক শিক্ষার উপকরণও সীমিত। গ্রাম ও শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধার পার্থক্য নতুন বইগুলোর বাস্তব প্রয়োগে বৈষম্য তৈরি করতে পারে।

চতুর্থ শ্রেণির জন্য প্রণীত ‘খেলাধুলা’ বইটি ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবার পাশাপাশি কারাতে, জুডো ও তায়কোয়ান্দোর মতো আত্মরক্ষামূলক কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসা, পুষ্টি, ইনজুরি প্রতিরোধ ও সামাজিক দক্ষতার বিষয়ও রাখা হয়েছে।

বইটির লক্ষ্য শিশুদের শারীরিক সক্ষমতা ও সুস্থ জীবনযাপনের অভ্যাস গড়ে তোলা। কিন্তু সাঁতার, কারাতে কিংবা বিভিন্ন খেলাধুলা শেখানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষক, মাঠ, সরঞ্জাম ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সব বিদ্যালয়ে আছে কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট বাস্তবায়ন পরিকল্পনা জানা প্রয়োজন। শুধু বই পড়ে এসব দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যাতে একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

চতুর্থ শ্রেণির ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি ১১টি অধ্যায়ে সাজানো হয়েছে। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যাভ্যাস, সামাজিক রীতিনীতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জীবনধারা তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বাংলা বর্ণমালা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা, পিঠা-পুলি এবং পারিবারিক সহযোগিতার বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বইটিতে ১৯৭৬ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে শুরু হওয়া শিশু-কিশোরদের প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাসও স্থান পেয়েছে বলে এনসিটিবি জানিয়েছে।

তবে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বৈচিত্র্য তুলে ধরতে আঞ্চলিক ভাষা, বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ঐতিহ্য, লোকজ জ্ঞান ও জীবনধারার প্রতিনিধিত্ব কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে, তা গুরুত্বপূর্ণ। সংস্কৃতির পাঠ যেন কেবল নির্দিষ্ট কিছু উৎসব বা ঐতিহ্যের বিবরণে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেদিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি ছয়টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে প্রচলিত মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে শেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতাকে শেখার উপকরণ হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু শিক্ষার্থীদের ওপর পরীক্ষার চাপ, নম্বরের প্রতিযোগিতা এবং অভিভাবকদের প্রত্যাশা অপরিবর্তিত থাকলে আনন্দভিত্তিক শিক্ষার দর্শন কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের পাঠদান, বাড়ির কাজ এবং পরীক্ষার ধরনে পরিবর্তন না এলে নতুন বইটি অতিরিক্ত পাঠ্যবই হিসেবেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি আটটি অধ্যায়ে প্রণীত হয়েছে। এতে প্রযুক্তির ব্যবহার, ছোট উদ্যোগ, সমস্যা সমাধান, সবুজ প্রযুক্তি ও টেকসই জীবনযাপনের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বাস্তবে কিছু করার সক্ষমতা তৈরিই এর উদ্দেশ্য।

তবে কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, ল্যাব এবং দক্ষ প্রশিক্ষকের বিকল্প নেই। এসব সুবিধা নিশ্চিত না করে শুধু পাঠ্যবইয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তোলার লক্ষ্য অর্জন কঠিন হতে পারে।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, এনসিসির চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি বই মুদ্রণের কাজ শেষ করার আশা রয়েছে।

প্রাথমিকভাবে চতুর্থ শ্রেণিতে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে আনন্দভিত্তিক শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি এবং অন্য দুটি বিষয় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের কথা জানিয়েছেন উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ কে এম শওকত আলী খান বলেন, নতুন বইগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হলেও এর সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় উপকরণ, মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার এবং শহর-গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগের বৈষম্য কমানো ছাড়া প্রত্যাশিত পরিবর্তন কঠিন। নতুন বইগুলো শিক্ষার্থীদের শেখার অভিজ্ঞতা বদলাবে, নাকি বিদ্যমান পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যুক্ত হবে, তার উত্তর মিলবে শ্রেণিকক্ষের বাস্তব প্রয়োগেই।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments