Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়জাতিসংঘে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ: ৪৬ বছরে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার

জাতিসংঘে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ: ৪৬ বছরে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রাধিকার

কৃষিবিদ নিয়াজ ইকবাল পাভেল:

১৯৮০ থেকে ২০২৬—৪৬ বছরের ব্যবধান। এই সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সমাজ, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বাস্তবতায় এসেছে বড় পরিবর্তন। একই সময়ে বদলেছে বিশ্বরাজনীতির কাঠামো, কূটনীতির অগ্রাধিকার এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার চ্যালেঞ্জ।

এই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে জাতিসংঘের মঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন একই পরিবারের তিন সদস্য—তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনটি ভিন্ন সময়ে তাঁদের বক্তব্যে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনও প্রতিফলিত হয়েছে।

২০২৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি ছিল জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে তাঁর প্রথম বক্তব্য। বাসসের প্রতিবেদনে এটিকে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্যের জাতিসংঘে ভাষণ দেওয়ার ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাঁর ভাষণে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, নারী ও যুব ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের মতো বিষয় উঠে আসে। ভাষণটি তিনি বাংলায় দেন।

১৯৮০: আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন

এর চার দশকেরও বেশি আগে, ১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। জাতিসংঘের সরকারি নথিতে তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রগতির সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে আসে।

সেই সময়ের আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, ক্ষুধা, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সংস্কার ছিল গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য। ফলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বক্তব্যেও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ন্যায়সংগততা ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

১৯৯৩: গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও বাংলাদেশের স্বার্থ

১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বক্তব্য দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তখন বাংলাদেশ সামরিক শাসন থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছিল।

সে সময় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের প্রশ্ন ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। একই সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনা ও গঙ্গার পানিবণ্টনও পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে।

ফলে ১৯৯০-এর দশকের কূটনৈতিক পরিসরে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, পানি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।

২০২৬: নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশের বার্তা

২০২৬ সালে এসে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আরও জটিল। জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের প্রশ্ন এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্ক ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত ছিল। এবারের অধিবেশনের সভাপতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খালিলুর রহমান। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২ জুন ২০২৬ ৮১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং অধিবেশন শুরু হয় ৮ সেপ্টেম্বর।

৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় আস্থা পুনর্গঠন ও পরিবর্তনশীল বাস্তবতা মোকাবিলার প্রশ্নকে এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে উঠে আসা বিষয়গুলো দেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকট তাঁর জাতিসংঘ সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। জাতিসংঘের একাধিক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বক্তব্য দেন।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে এক অনুষ্ঠানে তিনি নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট রোডম্যাপ, সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেন।

তিন সময়, তিন ধরনের অগ্রাধিকার

১৯৮০, ১৯৯৩ ও ২০২৬, এই তিনটি সময় পাশাপাশি রাখলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অগ্রাধিকারের পরিবর্তনটি স্পষ্টভাবে দেখা যায়।

১৯৮০ সালে গুরুত্ব পেয়েছিল আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বৈষম্য, দারিদ্র্য, উন্নয়ন এবং নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্ন। ১৯৯৩ সালে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং পানি-স্বার্থ সামনে আসে। আর ২০২৬ সালে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন, রোহিঙ্গা সংকট, প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কার।

তবে সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু ধারাবাহিকতা রয়েছে। উন্নয়নশীল দেশের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ন্যায়সংগত বৈশ্বিক ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা—এই বিষয়গুলো বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক বক্তব্যে ফিরে এসেছে।

পারিবারিক ধারাবাহিকতার বাইরে বৃহত্তর প্রেক্ষাপট

জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান একই পরিবারের সদস্য হলেও জাতিসংঘে তাঁদের বক্তব্যকে শুধু পারিবারিক ধারাবাহিকতার দৃষ্টিতে দেখলে বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপট আড়ালে থেকে যায়।

১৯৮০ সালের বিশ্ব ছিল স্নায়ুযুদ্ধ এবং উত্তর-দক্ষিণ অর্থনৈতিক বৈষম্যের বাস্তবতায় আবদ্ধ। ১৯৯৩ সালে স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী নতুন আন্তর্জাতিক বিন্যাস তৈরি হচ্ছিল। আর ২০২৬ সালের বিশ্বে জলবায়ু সংকট, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

ফলে একই পরিবারের তিন সদস্যের জাতিসংঘে উপস্থিতির ঘটনাটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ধারাবাহিকতা হলেও তাঁদের বক্তব্যের বিষয়বস্তু মূলত সংশ্লিষ্ট সময়ের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে।

২০২৬ সালের জাতিসংঘ সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রাধিকারগুলো তুলে ধরেছেন। একই সঙ্গে জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট, শান্তি, উন্নয়ন ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মতো বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থাপন করেছেন।

৪৬ বছরের ব্যবধানে তাই জাতিসংঘের মঞ্চ একই থাকলেও বাংলাদেশের সামনে থাকা প্রশ্নগুলো অনেকটাই বদলে গেছে। ১৯৮০ সালের অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের দাবি থেকে ১৯৯৩ সালের গণতন্ত্র ও পানি-স্বার্থ, আর ২০২৬ সালের জলবায়ু, প্রযুক্তি, রোহিঙ্গা সংকট ও বহুপাক্ষিক সংস্কার—এই ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিবর্তিত বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র তুলে ধরে।

জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভাষণ সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ অধ্যায় হিসেবে যুক্ত হলো।

-সাংবাদিক ও কলামিস্ট

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments