Homeপ্রধান সংবাদডেঙ্গুর দাপট: সেপ্টেম্বরে ১৪২ মৃত্যু, অক্টোবরে আরও ঝুঁকির শঙ্কা

ডেঙ্গুর দাপট: সেপ্টেম্বরে ১৪২ মৃত্যু, অক্টোবরে আরও ঝুঁকির শঙ্কা

বিশেষ প্রতিনিধি

ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। সেপ্টেম্বরেই প্রাণ গেছে ১৪২ জনের—চলতি বছরে এক মাসে এটাই সর্বোচ্চ মৃত্যু। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ছয়জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৯৪২ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ায় এ বছর ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩৯-এ। জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৭ হাজার ৬৭২ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ৫ হাজার ৪২৪ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। একই সময়ে ১ হাজার ৭৫১ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। নতুন রোগীদের মধ্যে ঢাকা বিভাগ, দুই সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশালসহ বিভিন্ন এলাকায় উল্লেখযোগ্য চাপ দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো, সংক্রমণ ও মৃত্যু—দুই সূচকই সেপ্টেম্বরজুড়ে দ্রুত বেড়েছে। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু ছিল পাঁচজন। জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ৪৩ জন মারা যান। সেপ্টেম্বরে এসে মৃত্যুর সংখ্যা এক লাফে ১৪২-এ পৌঁছেছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতি অক্টোবরেও খারাপ থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মেডিকেল এনটোমোলজিস্ট ড. কবিরুল বাশার বলেছেন, চলমান বৃষ্টি এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। এর প্রভাব সংক্রমণে পড়তে সময় লাগে; ফলে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টির প্রভাব অক্টোবরেও দেখা যেতে পারে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের শুরুতেও তিনি পূর্বাভাসভিত্তিক মডেলের তথ্য তুলে ধরে জানিয়েছিলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ অভিযান চালানো গেলে পরিস্থিতির অবনতি ঠেকানো সম্ভব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধন বা স্বল্পমেয়াদি অভিযান যথেষ্ট নয়। এডিসের প্রজননস্থল শনাক্ত করে তা ধ্বংস করা, নিয়মিত নজরদারি এবং সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত কার্যক্রম জরুরি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত কর্মসূচির প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিচ্ছেন। কারণ ডেঙ্গুর প্রকৃত সংক্রমণ সরকারি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যার চেয়েও বেশি হতে পারে—বিশেষ করে যারা হাসপাতালে না গিয়ে বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন তাদের তথ্য সরকারি হিসাবে না-ও আসতে পারে।

ডেঙ্গুতে একই পরিবারের একাধিক সদস্য আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পরিবারের কেউ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে তাকে মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে কামড়ানো এডিস মশা অন্য সদস্যদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারে।

বাসাবাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি, ফুলের টব, পরিত্যক্ত পাত্র, ডাবের খোসা কিংবা অন্যান্য ছোট পাত্রে জমে থাকা পানি এডিসের প্রজননস্থল হতে পারে। তাই মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু সিটি করপোরেশনের ওপর না রেখে নাগরিকদেরও নিয়মিতভাবে নিজেদের বাসা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর বিস্তারও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ২৬৪ এবং বরিশাল বিভাগে ২১৩ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চট্টগ্রামে ভর্তি হয়েছেন ৩০১ জন, রাজশাহীতে ১৯৭, ময়মনসিংহে ১২০, রংপুরে ৫৬ এবং সিলেটে ছয়জন।

খুলনা বিভাগে চলতি বছর এ পর্যন্ত ৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বরিশালেও বাড়ছে রোগীর চাপ। ফলে রাজধানীর বাইরে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

একদিকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে একই সময়ে মৌসুমি জ্বর, সর্দি-কাশি ও অন্যান্য রোগের রোগীর চাপও রয়েছে। ফলে হাসপাতালগুলোতে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্তকরণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী হাসপাতালে ভর্তি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, দেরিতে চিকিৎসা নিতে আসা এবং গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মৃত্যুঝুঁকি বাড়াতে পারে। পুনরায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও জটিলতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

চলতি বছরের ডেঙ্গু পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু মৌসুমি অভিযান দিয়ে এ রোগ নিয়ন্ত্রণ কঠিন। সেপ্টেম্বরে ১৪২ জনের মৃত্যু এবং এক মাসে বিপুলসংখ্যক নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর অক্টোবরের জন্য আগাম প্রস্তুতি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বৃষ্টির পর জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ, নিয়মিত লার্ভা জরিপ, প্রজননস্থল ধ্বংস, মশার ঘনত্ব পর্যবেক্ষণ এবং আক্রান্ত ব্যক্তিদের মশারি বা অন্যান্য উপায়ে মশার সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা—সবগুলো পদক্ষেপ একসঙ্গে নিতে হবে।

অন্যথায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়ার পাশাপাশি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments