আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কি একদিন মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে? এ নিয়ে প্রযুক্তিবিদ ও গবেষকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা চলছে। কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন, অত্যন্ত উন্নত এআই ভবিষ্যতে মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে তা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
২২ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য কনভারসেশন-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলসের এআই অধ্যাপক টবি ওয়ালশ এমন পাঁচটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন, যেগুলোর মাধ্যমে এআই মানবজাতির জন্য বড় বিপদ তৈরি করতে পারে।
তার আলোচনায় রয়েছে সুপারইন্টেলিজেন্স, ভুলভাবে নির্ধারিত লক্ষ্য, জৈব অস্ত্র, পারমাণবিক যুদ্ধ এবং এআইয়ের মাধ্যমে মানুষের নিজেদের ধ্বংসের ঝুঁকি।
১. সুপারইন্টেলিজেন্সের ঝুঁকি
সুপারইন্টেলিজেন্ট এআই মানুষের চেয়ে এমন মাত্রায় বুদ্ধিমান হয়ে উঠতে পারে, যার সক্ষমতা আগে থেকে অনুমান করাই কঠিন। তবে ওয়ালশ মনে করেন, এ ধরনের এআই এখনো মানুষের কাছ থেকে অনেক দূরে থাকতে পারে।
বর্তমান এআই মডেলগুলো নির্দিষ্ট কিছু কাজে অসাধারণ দক্ষ হলেও সব ধরনের কাজে এখনো মানুষের চেয়ে বেশি সক্ষম নয়। তবে জটিল গণিতসহ কিছু ক্ষেত্রে এআইয়ের সাম্প্রতিক অগ্রগতি ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
২. ‘পেপারক্লিপ’ পরিস্থিতি
এআইয়ের লক্ষ্য যদি ভুলভাবে নির্ধারণ করা হয়, তাহলে সেটি মানুষের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। দার্শনিক নিক বোস্ট্রমের বিখ্যাত ‘পেপারক্লিপ’ উদাহরণে একটি সুপারইন্টেলিজেন্ট এআইকে যত বেশি সম্ভব পেপারক্লিপ তৈরির লক্ষ্য দেওয়া হয়।
এআই তখন লক্ষ্য পূরণে পৃথিবীর সব সম্পদ ব্যবহার করতে পারে—এমনকি মানুষের অস্তিত্বও তার কাছে গুরুত্বহীন হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ এআই মানুষের প্রতি বিদ্বেষী না হলেও নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণের পথে মানুষকে বাধা হিসেবে বিবেচনা করতে পারে।
তবে বুদ্ধিমত্তা থাকলেই বাস্তবে সেই অনুযায়ী ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। আইন, জনমত, আদালত ও অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান এ ধরনের পরিস্থিতিতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৩. জৈব অস্ত্রের ঝুঁকি
উন্নত এআই ব্যবহার করে ভয়ংকর কোনো জৈব অস্ত্র তৈরির আশঙ্কাও আলোচনায় রয়েছে। এআই ফিউচার্স প্রজেক্টের ‘এআই ২০২৭’ পরিস্থিতিতেও এ ধরনের ঝুঁকির কথা উঠে এসেছে।
জেনেটিক ভাষা মডেলের অগ্রগতির কারণে এ আশঙ্কা আরও গুরুত্ব পেয়েছে। তবে অত্যন্ত সংক্রামক ও একই সঙ্গে অত্যন্ত প্রাণঘাতী ভাইরাস তৈরি করা সহজ নয়। জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত ছড়ানো ভাইরাস অনেক সময় তুলনামূলক কম প্রাণঘাতী হয়।
ইতিহাসে ব্ল্যাক ডেথ ছিল অন্যতম ভয়াবহ মহামারি। তবে আধুনিক চিকিৎসা ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে একই ধরনের রোগের প্রভাব বর্তমানে তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
৪. পারমাণবিক যুদ্ধ
এআই যদি কোনোভাবে পারমাণবিক অস্ত্রের কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তাহলে ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
ইতিহাসে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হওয়ার একাধিক ঘটনা রয়েছে। ২০১০ সালে স্টাক্সনেট কম্পিউটার ওয়ার্ম ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় সেন্ট্রিফিউজ অচল করে দিয়েছিল। ঘটনাটি দেখিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো সাইবার হামলার ঝুঁকি থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়।
পারমাণবিক সংঘাতের পর সম্ভাব্য ‘নিউক্লিয়ার উইন্টার’ও বড় মানবিক বিপর্যয় তৈরি করতে পারে। বিস্ফোরণের পর বায়ুমণ্ডলে ধোঁয়া ও ধুলা ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক তাপমাত্রা কমে গিয়ে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে।
৫. মানুষই নিজেদের ধ্বংস করতে পারে
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়তো সরাসরি এআইয়ের হাতে মানুষের মৃত্যু নয়; বরং এআইয়ের অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষের নিজেদের তৈরি সামাজিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এআই ব্যাপকভাবে মানুষের চাকরি প্রতিস্থাপন করতে পারে, ভুল তথ্যের বিস্তার বাড়াতে পারে, রাজনৈতিক বিভাজন তীব্র করতে পারে এবং মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এভাবে প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে মানুষের নিজেদের সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতাই দুর্বল হয়ে পড়বে।
তবে এসবই সম্ভাব্য পরিস্থিতি, নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী নয়। এআইয়ের ভবিষ্যৎ প্রভাব নির্ভর করবে প্রযুক্তির অগ্রগতি, এর ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সিদ্ধান্তের ওপর।
