Homeঅর্থনীতিরূপপুরের বিদ্যুৎ কবে? শেষ ধাপে প্রথম ইউনিট

রূপপুরের বিদ্যুৎ কবে? শেষ ধাপে প্রথম ইউনিট

বি-টু অনুমতির অপেক্ষা, ক্রিটিক্যালিটির পর ধাপে ধাপে উৎপাদন; প্রস্তুত ৮ সঞ্চালন লাইন

তানভীর রায়হান:

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ পাওয়ার অপেক্ষা এখন শেষ পর্যায়ে। প্রথম ইউনিটের স্টেজ বি-ওয়ানের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রায় শেষ হওয়ায় পরবর্তী ধাপ বি-টুতে যাওয়ার অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (বায়রা) অনুমোদন মিললেই চুল্লিতে ক্রিটিক্যালিটি অর্জনের প্রস্তুতি শুরু হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

তবে রূপপুরে ক্রিটিক্যালিটি শুরু হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে না। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে নিয়ন্ত্রিতভাবে চেইন রিঅ্যাকশন চালু করে চুল্লির কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হবে। পরে ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানো হবে। নির্ধারিত সক্ষমতায় পৌঁছানোর পর উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে।

ফলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা প্রশ্ন, রূপপুর থেকে কবে বিদ্যুৎ আসবে—তার উত্তর এখন নির্ভর করছে বি-টু অনুমোদন, ক্রিটিক্যালিটি এবং পরবর্তী কমিশনিং ধাপ সফলভাবে শেষ হওয়ার ওপর।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবির হোসেন বলেন, “আমরা সবকিছু বায়রাকে সাবমিট করেছি। পারমিশন পেলেই আমরা পরবর্তী স্টেজে যাব, যেটাকে বি-টু বলে।”

অনুমোদনের অপেক্ষায় প্রথম ইউনিট

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথম ইউনিটের স্টেজ বি-ওয়ানের আওতায় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সর্বশেষ স্বয়ংক্রিয় চাপ প্রশমন ভালভ পরীক্ষাকে ঘিরে যে জটিলতা তৈরি হয়েছিল, সেটিও কাটিয়ে ওঠা হয়েছে।

এখন প্রকল্প কর্তৃপক্ষের জমা দেওয়া নথি ও পরীক্ষার ফলাফল পর্যালোচনা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পারমাণবিক স্থাপনার ক্ষেত্রে প্রতিটি পর্যায়ে আলাদা নিরাপত্তা যাচাই এবং অনুমোদন প্রয়োজন হওয়ায় কোনো ধাপ দ্রুত শেষ করার সুযোগ নেই।

প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা জানান, বি-টু পর্যায়ে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট সব নিরাপত্তা ও কারিগরি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। অনুমোদনের পরই পরবর্তী ধাপের কার্যক্রম শুরু করা হবে।

ক্রিটিক্যালিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্রিটিক্যালিটি হচ্ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ পর্যায়ে চুল্লির ভেতরে নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন সৃষ্টি করা হয়।

তবে এ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরও কেন্দ্রটি তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণ ক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে যায় না। নিরাপত্তা ও কারিগরি ব্যবস্থাগুলো পর্যবেক্ষণ করে ধাপে ধাপে চুল্লির ক্ষমতা বাড়ানো হয়। প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়িয়ে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট পর্যায়ে পৌঁছানোর পর জাতীয় সঞ্চালন লাইনে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এরপর পরীক্ষামূলক উৎপাদন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ইউনিটটির পূর্ণ উৎপাদন ক্ষমতার দিকে এগোনোর কথা।

গ্রিড প্রস্তুত, শেষ হয়নি অপেক্ষা

রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সঞ্চালন অবকাঠামোও প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রূপপুর থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য আটটি সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব লাইনের নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে তা জাতীয় সঞ্চালন ব্যবস্থায় যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত প্রস্তুতি রয়েছে। এখন মূল অপেক্ষা উৎপাদন শুরুর আগে পারমাণবিক নিরাপত্তা ও কমিশনিংয়ের বাকি ধাপগুলোর।

বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উৎপাদন ও সঞ্চালন—দুই ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করেই রূপপুরের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে নেওয়া হবে। নতুন এই বিদ্যুৎ দেশের সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়বে।

নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা

রূপপুরের বিদ্যুৎ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশা বাড়লেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকল্পটির ক্ষেত্রে সময়ের চেয়ে নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কমিশনিং প্রচলিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো নয়। চুল্লি চালু করার আগে এবং চালুর পর প্রতিটি পর্যায়ে সিস্টেমের কার্যকারিতা যাচাই করতে হয়।

বুয়েটের একজন জ্বালানি ও অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্রিটিক্যালিটি অর্জন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে পূর্ণ বাণিজ্যিক উৎপাদনের সমার্থক হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ক্রিটিক্যালিটির পর ধাপে ধাপে ক্ষমতা বাড়িয়ে প্রতিটি পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সিস্টেমের স্থিতিশীলতা যাচাই করতে হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রূপপুরের সফল কমিশনিং শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াবে না, বাংলাদেশের পারমাণবিক প্রযুক্তি পরিচালনার সক্ষমতারও পরীক্ষা হবে। চুল্লি পরিচালনা, প্রশিক্ষিত জনবল, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা—সব ক্ষেত্রেই সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে।

বড় বিনিয়োগের প্রকল্প, প্রত্যাশাও বড়

রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় নির্মিত হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিট। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদন সক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বড় পরিমাণ বেসলোড বিদ্যুৎ যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

দেশে বিদ্যুৎ চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। এ অবস্থায় রূপপুরের বিদ্যুৎ নিয়ে শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ গ্রাহকদের প্রত্যাশাও বেশি।

তবে প্রকল্পের কর্মকর্তারা বলছেন, রূপপুরের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরাপদ ও নিয়মতান্ত্রিকভাবে প্রতিটি ধাপ শেষ করা। নির্ধারিত পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন শেষ হওয়ার পরই উৎপাদনের পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়া হবে।

অর্থাৎ রূপপুর এখন আর শুধু নির্মাণাধীন প্রকল্প নয়; প্রথম ইউনিটের কার্যক্রম বিদ্যুৎ উৎপাদনের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছেছে। বি-টু অনুমোদন হচ্ছে সেই দরজার পরবর্তী চাবি। অনুমোদনের পর ক্রিটিক্যালিটি, ধাপে ধাপে ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ—এই তিন ধাপ পেরোলেই দেশের মানুষ বাস্তবে রূপপুরের বিদ্যুৎ পাওয়ার সুযোগ পাবে।

এখন তাই প্রশ্ন শুধু “রূপপুরে বিদ্যুৎ উৎপাদন কবে?” নয়; বরং নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক শর্ত পূরণ করে কত দ্রুত প্রথম ইউনিটকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নেওয়া যায়, সেটিই হয়ে উঠেছে প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments