Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির মাধ্যমে জাতির অগ্রযাত্রা

জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির মাধ্যমে জাতির অগ্রযাত্রা

সালমান সাদেকিন চয়ন:

বাংলাদেশ যখন উন্নয়নশীল দেশের পরিচয় পেরিয়ে একটি স্মার্ট, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই দেশ নতুন ও সম্ভাবনাময় উন্নয়নের দিগন্ত উন্মোচন করছে। কয়েক দশক ধরে তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয় এবং শ্রমনির্ভর ঐতিহ্যবাহী খাতগুলো জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এসব খাত লাখো মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসতে সহায়তা করেছে, জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করেছে এবং সামষ্টিক অর্থনীতির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। তবে একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন—জ্ঞান, উদ্ভাবন ও মেধাসম্পদ।

বাংলাদেশের মতো প্রাণবন্ত, উদ্যমী ও ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য বিপুল জনমিতিক সুবিধার পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শুধু শারীরিক শ্রমের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বরং এমন একটি শক্তিশালী ও ভবিষ্যৎমুখী জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে, যেখানে মানুষের সৃজনশীলতা, উন্নত বিজ্ঞান, আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবন একত্রে দেশকে বিশ্বমঞ্চে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

ঐতিহ্যগত অর্থনৈতিক কাঠামোতে জাতীয় সম্পদ মূলত বস্তুগত সম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও মানুষের শ্রমের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। বিপরীতে, আধুনিক জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা অর্জনের জন্য জ্ঞানের ধারাবাহিক সৃষ্টি, বিস্তার ও ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয়। বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি, জীবপ্রযুক্তি, পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর নকশা এবং বিশেষায়িত ডিজিটাল সেবার মতো উচ্চপ্রযুক্তিনির্ভর খাত বৈশ্বিক সম্পদ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়া বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার এক নতুন দুয়ার খুলে দিতে পারে। বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত পরিবর্তনকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে না দেখে দেশীয় সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সফটওয়্যার উন্নয়ন, উচ্চমূল্যের জ্ঞানভিত্তিক পণ্য ও ডিজিটাল উদ্ভাবনের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ রয়েছে।

জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য বাংলাদেশের সামনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী। দেশের ৩৫ বছরের কম বয়সী মানুষের সংখ্যা ৬০ শতাংশের বেশি বলে লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। প্রযুক্তির প্রতি আগ্রহী ও উদ্যমী এই প্রজন্ম ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহার, ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন তৈরি এবং আধুনিক ই-কমার্সে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।

পাশাপাশি দেশজুড়ে ফাইবার-অপটিক সংযোগ, উচ্চগতির মোবাইল ইন্টারনেট, হাইটেক পার্ক, সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক এবং ইনকিউবেশন সেন্টারের সম্প্রসারণ উদ্ভাবনের পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। আর্থিক প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, কৃষিপ্রযুক্তি ও শিক্ষাপ্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপের বিকাশও প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের তরুণেরা দৈনন্দিন সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে দেশীয় প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে সক্ষম।

তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করতে হলে শিক্ষা, গবেষণা, শিল্প ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতির বিকাশে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণী চিন্তা, তথ্য-উপাত্ত ব্যবহারের দক্ষতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা এবং উদ্ভাবনী চিন্তাকে উৎসাহিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমন পরিবেশ গড়ে তোলা দরকার, যেখানে শিক্ষার্থীরা শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা ও সমস্যা সমাধানকারী হিসেবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারে।

শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যক্রম নিয়মিত হালনাগাদ করাও জরুরি। এতে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে নিজেদের দক্ষতা মিলিয়ে নিতে পারবে।

একই সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানো, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে প্রণোদনা দেওয়া এবং মেধাভিত্তিক সাফল্যকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে শুধু ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সীমাবদ্ধ না রেখে আজীবন শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে। নমনীয় শিক্ষাপদ্ধতি, স্বল্পমেয়াদি দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং মাইক্রো-ক্রেডেনশিয়াল কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মজীবী মানুষও নতুন দক্ষতা অর্জন করতে পারবেন।

এ ছাড়া ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা, মেধাস্বত্বের সুরক্ষা এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বা ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ দেশীয় স্টার্টআপ ও আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করতে পারে।

জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতি শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি সামাজিক উন্নয়নেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। টেকসই নগর পরিকল্পনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট কৃষি এবং সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার মতো বাস্তব সমস্যার সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।

ডিজিটাল সাক্ষরতা ও সমালোচনামূলক চিন্তার প্রসার নিশ্চিত করতে পারলে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এতে প্রযুক্তিগত বৈষম্য কমানো এবং উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।

যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করবে, তখন উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান ও সমৃদ্ধি অর্জনের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া তৈরি হবে।

বিশ্ববাজারে ডিজিটাল সেবা, সফটওয়্যার রপ্তানি, দূরবর্তী পেশাগত সহযোগিতা এবং বিশেষায়িত প্রযুক্তিগত সমাধানের চাহিদা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দক্ষ পেশাজীবী ও উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।

ধারাবাহিক শিক্ষা, উদীয়মান প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্ববাজারে উদ্ভাবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। এর ফলে দেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত হওয়ার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং জ্ঞান বিনিময়ের সুযোগও বাড়বে।

জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় লক্ষ্য। এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে দেশের লাখো তরুণের মেধা, সৃজনশীলতা ও সম্ভাবনা। দূরদর্শী শিক্ষাসংস্কার, কার্যকর শিল্পনীতি, গবেষণায় বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে জনসংখ্যাগত সুবিধাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করা সম্ভব।

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন শুধু শ্রম ও প্রচলিত উৎপাদন খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকবে না; বরং জ্ঞান, প্রযুক্তি, গবেষণা ও মেধাসম্পদের কার্যকর ব্যবহারের ওপরও নির্ভর করবে। এই লক্ষ্য অর্জনে রাষ্ট্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। জ্ঞানকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক কল্যাণের চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে পারলেই বাংলাদেশ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও সমৃদ্ধ, সক্ষম ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারবে।

-সহকারী পরিচালক (তথ্য ও প্রকাশনা)
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments