তানভীর রায়হান:
রাজধানীর লালমাটিয়ায় আবাসিক জীবনের জায়গা ক্রমেই দখল করছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। মাত্র ০.৭৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই এলাকায় ঘুরে এক দিনেই ৩০টির বেশি স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টার ও বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সন্ধান পাওয়া গেছে। কোথাও একই সড়কে পাশাপাশি একাধিক প্রতিষ্ঠান, কোথাও একই প্রতিষ্ঠানের একাধিক ক্যাম্পাস। এতে শিক্ষার সুযোগ বাড়লেও যানজট, ফুটপাত দখল, সড়কে চাপ এবং আবাসিক পরিবেশের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) তথ্য অনুযায়ী, লালমাটিয়া আবাসিক এলাকার আয়তন ০.৭৩ বর্গকিলোমিটার। সরেজমিনে দেখা গেছে, বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলের পাশাপাশি মাদ্রাসা, কোচিং সেন্টার এবং সৃজনশীল ও পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে এখানে। অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অন্তত ছয়টি ক্যাম্পাসের সন্ধান পাওয়া গেছে।
তবে এলাকায় মোট কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর কতটি অনুমোদিত এবং এক নিবন্ধনের আওতায় একাধিক ক্যাম্পাস পরিচালিত হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারের পাশাপাশি অনুমোদন, তদারকি ও আবাসিক এলাকার ধারণক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
লালমাটিয়ায় সরকারি লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটি উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়, লালমাটিয়া সরকারি মহিলা কলেজ, লালমাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লালমাটিয়া গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। পাশাপাশি অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, অক্সফোর্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, অ্যাকাডেমিয়া, কোকাবুররা অস্ট্রেলিয়ান স্ট্যান্ডার্ড স্কুল, ক্রেস্টউড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও আরও কয়েকটি ইংরেজি মাধ্যমের প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে।
এ ছাড়া জামিয়া ইসলামিয়া, মাদ্রাসা নূরে মদিনা, মাশকুল কোরআন, মাদরাসাতুল কলম ও ইসলামিয়া মাদ্রাসার মতো ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও রয়েছে। স্কুলের বাইরে আছে শান্ত-মারিয়াম ইনস্টিটিউট অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, ফিউচার ব্যারিস্টার্স অ্যাকাডেমি এবং বিভিন্ন কোচিং সেন্টার।
লালমাটিয়ার আশপাশেও রয়েছে সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউট, সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল কলেজ, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ এবং সেন্ট জোসেফ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। মোহাম্মদপুরের ঢাকা রেসিডেনশিয়াল মডেল কলেজ ও মোহাম্মদপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয়েও প্রতিদিন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের যাতায়াত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, স্কুলের ক্লাস শুরু ও ছুটির সময় সড়কে যানজট তৈরি হয়। ফুটপাত ও সড়কের ওপর চাপ বাড়ায় বাসিন্দাদের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
লালমাটিয়া হাউজিং সোসাইটির নিরাপত্তা কমিটির সভাপতি বেলাল আহমেদ বলেন, “লালমাটিয়ায় কোচিং সেন্টার ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের সংখ্যা এত বেড়ে গেছে যে, আমরা এলাকাবাসী এখন অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছি। এসব প্রতিষ্ঠানের কারণে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে।”
তিনি বলেন, একের পর এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেও আবাসিক এলাকার ধারণক্ষমতা ও বাসিন্দাদের সুবিধা-অসুবিধা যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না। তাঁর মতে, কোথায় কতটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।
লালমাটিয়ার ডি ব্লকে পিস স্কুলের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৬ সালের আগস্টে বিতর্কিত কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগের পর শিক্ষা মন্ত্রণালয় লালমাটিয়ার পিস ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের পাঠদানের অনুমতি বাতিলের নির্দেশ দেয়। পরে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড স্কুলটির সাময়িক নিবন্ধন বাতিল করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, পুরোনো ভবন ভেঙে সেখানে অ্যাভেরোজ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তাঁদের কেউ কেউ দাবি করেন, পিস স্কুলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে ডি ব্লকে পিস স্কুলের কার্যক্রম দেখা যাওয়ায় এর নিবন্ধন ও অনুমোদনের অবস্থা যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এসব দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্ব নিয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা গেছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর অনুমোদন ও স্বীকৃতির বিষয়টি ঢাকা শিক্ষা বোর্ড দেখে এবং প্রতিষ্ঠান চালু বা বন্ধ করার বিষয়টিও তাদের এখতিয়ারভুক্ত।
অন্যদিকে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর অনুমোদন দেওয়ার দায়িত্ব বর্তমানে বোর্ডের এখতিয়ারবহির্ভূত। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেয়। তবে বোর্ড পরীক্ষা, নিবন্ধন, ফরম পূরণ ও পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়মের বিষয়গুলো দেখে।
একই এলাকায় একাধিক প্রতিষ্ঠান অনুমোদন পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানের চাহিদার ভিত্তিতে অনুমোদন দেওয়া হয়। শহরাঞ্চলে একই ভবনে একাধিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হতে পারে। তবে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
সাবেক অধ্যক্ষ, শিক্ষাবিদ ও শিশুসাহিত্যিক মো. রহমত উল্লাহ বলেন, ছোট্ট এলাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা শিক্ষা খাতে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ঘাটতি তুলে ধরে। বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, আরবি মাধ্যম ও অন্যান্য ধারার প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠ্যক্রম, শিক্ষকদের যোগ্যতা, শিক্ষার পরিবেশ, ফি এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি প্রয়োজন।
তাঁর মতে, সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা ও মাদ্রাসার অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ আলাদা হওয়ায় সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। সরকারি ও অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করতে না পারাও নতুন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার অন্যতম কারণ হতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
শিক্ষাবিদ রাশেদা কে. চৌধূরীও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে পরিকল্পনা ও তদারকির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, কোথায় কতটি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করে অনুমোদন দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে নজরদারির জন্য প্রয়োজনীয় জনবল বাড়াতে হবে।
লালমাটিয়ার বাসিন্দাদের দাবি, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি আবাসিক এলাকার সড়ক, ফুটপাত, নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, নিবন্ধন, ক্যাম্পাস পরিচালনা এবং এলাকার ধারণক্ষমতা নিয়ে সমন্বিত জরিপ ও পরিকল্পনা করা গেলে শিক্ষার প্রসার এবং আবাসিক জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হতে পারে।



