সম্পাদকীয়:
একটি শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়া যেমন তার পরিবারের জন্য উদ্বেগের, তেমনি প্রতিরোধযোগ্য এই রোগে একটি শিশুর মৃত্যুও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সক্ষমতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। অথচ বাংলাদেশে সাত মাসের বেশি সময় ধরে চলা হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উদ্ধৃত তথ্যমতে, এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে ১ হাজার ২১৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০৪ শিশু; অন্য ১ হাজার ১১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গ নিয়ে। সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ২ লাখ ১৮ হাজার। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি রোগের বিস্তার নয়, বরং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।
হাম প্রতিরোধে কার্যকর টিকা রয়েছে। ফলে রোগটির বিস্তার ও মৃত্যুহার কমাতে টিকাদান কর্মসূচির আওতা, নিয়মিততা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিপুলসংখ্যক শিশু নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে থাকলে তার কারণ অনুসন্ধান জরুরি। টিকার সরবরাহে ঘাটতি, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, অভিভাবকদের অসচেতনতা কিংবা কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রশাসনিক দুর্বলতা, কোন বিষয়টি কতটা দায়ী, তা তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। অনুমান বা রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না।
এখানে সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো, টিকা না পাওয়া শিশুদের শনাক্ত করে দ্রুত তাদের আওতায় আনা। কোন এলাকায় সংক্রমণ বেশি, কোন বয়সের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এবং মৃত শিশুদের টিকাদানের ইতিহাস কী, এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রয়োজনে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি চালু করতে হবে। দুর্গম ও পিছিয়ে থাকা এলাকায় স্বাস্থ্যকর্মীদের পৌঁছানো এবং টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সংকট মোকাবিলা শুধু টিকাদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। হামে আক্রান্ত শিশুদের অনেকের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে। এসব শিশুর জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় ওষুধ, দক্ষ চিকিৎসক এবং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার। একই সময়ে ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের চাপ সামলাতে গিয়ে হাসপাতালগুলোতে যেন শিশুদের চিকিৎসা ব্যাহত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে। অসুস্থ শিশুকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরতে হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য স্বাস্থ্যসেবার চিত্র হতে পারে না।
এই পরিস্থিতিতে জবাবদিহিও জরুরি। টিকাদান কর্মসূচি থেকে এত শিশু কেন বাদ পড়ল, কোথায় ঘাটতি ছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের স্বচ্ছ উত্তর দিতে হবে। অতীতের কোনো সরকারের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে দায় নির্ধারণের বিতর্কে বর্তমান সংকট মোকাবিলার কাজ যেন থেমে না থাকে।
অভিভাবকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শিশুর টিকাদানের সময়সূচি অনুসরণ, টিকার নথি সংরক্ষণ এবং জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। তবে জনসচেতনতার দায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দুর্বলতা আড়াল করা যাবে না। টিকা সহজলভ্য করা, নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচার এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।
হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এখন প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, টিকাদান, রোগ শনাক্তকরণ, হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জনসচেতনতা এবং জবাবদিহি। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যকে কাগুজে অঙ্গীকারে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে। কারণ প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুমৃত্যু কমানো শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের মৌলিক জনস্বাস্থ্য অঙ্গীকারেরও পরীক্ষা।



