Homeবিবিধঅপরাধমাদ্রাসার অবকাঠামো নেই, বরাদ্দের ৪ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

মাদ্রাসার অবকাঠামো নেই, বরাদ্দের ৪ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ

কুষ্টিয়ায় টিআর প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ; সংবাদ প্রকাশের পর জমিতে বালু ভরাট শুরু

কুষ্টিয়া প্রতিনিধি:

কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় মাদ্রাসার ভবন ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য সরকারি বরাদ্দ পাওয়া চার লাখ টাকা উত্তোলনের পরও নির্ধারিত সময়ে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়নকাজ না করার অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি হাফিজুর রহমান জিহাদীর বিরুদ্ধে। ধানিজমিতে মাদ্রাসার সাইনবোর্ড স্থাপন করে বরাদ্দের অর্থ উত্তোলন করা হলেও সেখানে ভবন, সীমানাপ্রাচীর কিংবা মাটি ভরাটের কাজ হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে সংবাদ প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে জমির পাশে বালু ভরাট শুরু হয়েছে।

কুষ্টিয়া শহরের চৌড়হাস কোল্ডস্টোরেজ-সংলগ্ন ওই জমিতে বৃহস্পতিবার শ্রমিকদের বালু ফেলতে দেখা যায়। শ্রমিকেরা জানান, দিনমজুরির ভিত্তিতে তাঁদের কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন শ্রমিক বলেন, সেখানে কাজ করতে এসে তাঁদের মনে হয়েছে, এর আগে জমিতে কোনো উন্নয়নকাজ হয়নি। তাঁদের ভাষ্য, জমিটি সংসদ সদস্য আমির হামজার আত্মীয় হাফিজুর রহমান জিহাদীর।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘আহসাবে সুফফা নূরানী হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা’র মাটি ভরাট ও সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের জন্য ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চার লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও জমিতে মাদ্রাসার কোনো ভবন, সীমানাপ্রাচীর কিংবা মাটি ভরাটের দৃশ্যমান কাজ পাওয়া যায়নি। জমিতে ধানের আবাদ ছিল এবং নিচু অংশে পানি জমে ছিল। জমির আইলে স্থাপিত সাইনবোর্ডে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘প্রস্তাবিত নির্ধারিত স্থান’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি জিহাদী দুই দফায় বরাদ্দের পুরো চার লাখ টাকা উত্তোলন করেন। প্রথম দফায় দুই লাখ টাকা তোলার পর দৃশ্যমান কাজ না করেই বাকি অর্থ ছাড়ের জন্য তাগাদা দেন তিনি। সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে কয়েকবার কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে বাকি দুই লাখ টাকার চেক নিজের নামে নিয়ে ব্যাংক থেকে অর্থ উত্তোলন করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের সূত্র জানায়, সংসদ সদস্য আমির হামজার সুপারিশে প্রতিষ্ঠানটির জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। প্রকল্প বাস্তবায়নে জিহাদীকে সভাপতি করে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

চলতি মাসে একই প্রতিষ্ঠানের নামে নতুন বরাদ্দের আবেদন করা হলেও আগের প্রকল্পের কাজ নিয়ে আপত্তি থাকায় উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস আবেদনটি ফেরত পাঠায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকল্পের কাজ জুনের মধ্যে শেষ করে ছবিসহ অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংবাদ প্রকাশ ও পরবর্তী অনুসন্ধানের পর বৃহস্পতিবার জমির পাশে বালু ভরাট শুরু হলেও এই কাজ আগের বরাদ্দের আওতায় হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

সরেজমিনে দেখা যায়, শ্রমিকেরা জমির পাশে বালু ফেলছেন। তবে কাজ কত দিন চলবে, প্রকল্পের কতটুকু কাজ বাকি এবং অর্থের উৎস কী—এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি বরাদ্দের অর্থের ব্যবহার এবং প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা মিঠুন অভিযোগ করে বলেন, ‘মাদ্রাসার নাম ভাঙিয়ে সাইনবোর্ড দিয়ে প্রতারণা করা হয়েছে। এখানে মাদ্রাসার কোনো অবকাঠামো নেই। এমপির ঘনিষ্ঠ হওয়ায় টিআর বরাদ্দ নিয়ে নয়ছয় করেছেন জিহাদী।’

হাফিজুর রহমান জিহাদী দাওয়াতি সংগঠন দাঈ ইলাল্লাহ ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় তাফসিরবিষয়ক সম্পাদক। তিনি সদর উপজেলার হরিপুর ইউনিয়নের একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি ওয়াজ-নসিহত করেন। স্থানীয়ভাবে তিনি সংসদ সদস্য আমির হামজার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।

অভিযোগের বিষয়ে জিহাদী বলেন, ‘আমির হামজা ভাইয়ের (এমপি) তত্ত্বাবধানে আমি কাজ করছি।’ ধানিজমিতে সাইনবোর্ড স্থাপনের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, জমিটি মাদ্রাসার নয়। বরাদ্দের অর্থের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি বালু-মাটি ভরাটের জন্য বরাদ্দ পেয়েছি।’

কুষ্টিয়া সদর উপজেলার সাবেক প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বর্তমানে মিরপুর উপজেলায় কর্মরত। তিনি বলেন, ‘আমি তখন সদরে দায়িত্বে ছিলাম, এখন মিরপুরে আছি। বিষয়টি ঠিক মনে নেই, খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ পর্যবেক্ষণ করেই বিল ছাড় দেওয়া হয়।’

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হারুণ অর রশিদ বলেন, ‘এমপি মহোদয় এই ধরনের একটি প্রকল্প দিয়েছিলেন বলে মনে পড়ে। কাজ না হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সংসদ সদস্য আমির হামজার ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments