Homeঅর্থনীতিবছরে ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে, নতুন চাকরি মাত্র ৬ লাখ

বছরে ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে, নতুন চাকরি মাত্র ৬ লাখ

তানভীর রায়হান:

দেশের অর্থনীতির আকার বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধি পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারছে না। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। অথচ বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস উদ্ধৃত করে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী অর্থবছরে দেশে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে মাত্র ৬ লাখ ৩০ হাজার। এই ব্যবধান শ্রমবাজারে চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করছে।

অর্থনীতির আকার, রপ্তানি আয় কিংবা শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি একটি দেশের অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক। কিন্তু এসব সূচকের সঙ্গে কর্মসংস্থান, আয় ও জীবনযাত্রার মানের উন্নতি না ঘটলে প্রবৃদ্ধির সুফল নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সেই বৈপরীত্যই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রকৃত জিডিপি গড়ে বছরে ৬ দশমিক ৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। কিন্তু কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার সেই অনুপাতে বাড়েনি। অর্থনীতিতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহৃত হয় ‘এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি’ বা কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩-২০১০ সময়ে এ হার ছিল ০.৪৪; ২০১০-২০১৭ সময়ে কমে ০.২২ এবং ২০১৭-২০২৪ সময়ে সামান্য বেড়ে ০.২৭ হয়েছে।

শিল্প ও উৎপাদন খাতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। তথ্য অনুযায়ী, শিল্প খাতের কর্মসংস্থান স্থিতিস্থাপকতা ২০০৩-২০১০ সময়ে ০.৮৪ থাকলেও ২০১৭-২০২৪ সময়ে ঋণাত্মক ০.০৪ হয়েছে। উৎপাদন খাতে এ হার ঋণাত্মক ০.১০। অর্থাৎ উৎপাদন বাড়লেও কর্মসংস্থান একই হারে বাড়ছে না; কিছু ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান কমার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অটোমেশন, সীমিত বেসরকারি বিনিয়োগ, জ্বালানি সংকট এবং দক্ষতার সঙ্গে চাকরির চাহিদার অসামঞ্জস্য এ পরিস্থিতির পেছনে ভূমিকা রাখছে। তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। তবে নতুন বিনিয়োগ ও নতুন বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হলে প্রযুক্তির সুফল শ্রমবাজারে সমানভাবে প্রতিফলিত হয় না।

অন্যদিকে, উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকঋণ প্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা এবং গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ বাড়াতে না পারলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।

শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বও এই সংকটের আরেকটি দিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পরও অনেক তরুণ প্রত্যাশিত চাকরি পাচ্ছেন না। এর একটি কারণ হিসেবে চাকরির বাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিগরি দক্ষতার অসামঞ্জস্যকে চিহ্নিত করা হচ্ছে। ফলে একদিকে নিয়োগকর্তারা প্রয়োজনীয় দক্ষতার কর্মী খুঁজছেন, অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণেরা কাজের সুযোগের অপেক্ষায় থাকছেন।

অর্থনীতিবিদ ও নলেজ হাব ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, শুধু জিডিপি বাড়ানোর নীতি থেকে সরে এসে কর্মসংস্থানকে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, রপ্তানিমুখী বহুমুখী পণ্য এবং শ্রমঘন খাতকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে সংস্কার প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে শিক্ষার সঙ্গে চাকরির যোগসূত্র শক্তিশালী করার ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।

কর্মসংস্থানের পরিমাণের পাশাপাশি কাজের মান নিশ্চিত করাও জরুরি। অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের নিয়মিত চুক্তি, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা সীমিত। ফলে শুধু নতুন চাকরির সংখ্যা বাড়লেই হবে না; ন্যায্য মজুরি ও স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।

অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য তাই শুধু জিডিপির আকার দিয়ে বিচার করা যায় না। প্রবৃদ্ধি কতটা নতুন চাকরি তৈরি করছে, কতজন তরুণকে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের আয় ও জীবনমান কতটা উন্নত করছে, এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির বাস্তব চিত্র।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments