Homeবিবিধফিচারশিশুর মনের ভয় কাটাবেন যেভাবে

শিশুর মনের ভয় কাটাবেন যেভাবে

সানু:

শিশুর মন বড়দের মতো নয়। বড়দের কাছে যে বিষয়টি তুচ্ছ, তা-ই শিশুর কাছে ভয়ের বড় কারণ হয়ে উঠতে পারে। অন্ধকার ঘর, বজ্রপাতের শব্দ, নতুন স্কুল কিংবা চিকিৎসকের কাছে যাওয়া—এসব নিয়ে ভয় পাওয়া শিশুর বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক অংশ। তবে এই ভয় যখন শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে, তখন তা কাটিয়ে উঠতে মা-বাবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুর ভয় দূর করতে তাকে বকাঝকা বা জোর করার পরিবর্তে তার অনুভূতি বোঝা, নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া এবং ধীরে ধীরে ভয়ের পরিস্থিতির সঙ্গে পরিচিত করানো প্রয়োজন।

শিশুর নিজের অনুভূতি বুঝতে পারা এবং তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা তৈরি হওয়া জরুরি। মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘সেলফ-রেগুলেশন’। এই দক্ষতা গড়ে উঠলে শিশু ভয় বা উদ্বেগের পরিস্থিতিতে নিজেকে সামলাতে শেখে।

বড়রা ভয় পেলে অনেক সময় নিজেদের আশ্বস্ত করতে পারেন যে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু শিশুদের মধ্যে এই দক্ষতা তৈরি হতে সময়, অনুশীলন ও উপযুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। তাই অভিভাবকদের ধৈর্য ধরে শিশুকে এ বিষয়ে সহায়তা করতে হবে।

অনেক শিশু অন্ধকারে ভয় পায়। এ সময় অভিভাবকেরা কখনো কখনো বলে ফেলেন, ‘এতে ভয় পাওয়ার কী আছে!’ কিন্তু এমন মন্তব্য শিশুর মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সে ভাবতে পারে, তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই।

এর পরিবর্তে শিশুর পাশে বসে বলুন, ‘আমি বুঝতে পারছি তোমার ভয় লাগছে। ভয় পেয়ো না, আমি তোমার পাশেই আছি।’ নিজের শৈশবের কোনো ভয়ের অভিজ্ঞতাও তার সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন। এতে শিশু নিজেকে নিরাপদ ও বোঝা হয়েছে বলে অনুভব করবে।

শিশু ভয় পেলেই তাকে বারবার সেই পরিস্থিতি থেকে সরিয়ে নিলে তার মধ্যে এ ধারণা তৈরি হতে পারে যে পরিস্থিতিটি সত্যিই বিপজ্জনক এবং এড়িয়ে চলাই একমাত্র সমাধান।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয় এড়িয়ে চলার পরিবর্তে ধীরে ধীরে তা মোকাবিলা করতে শেখানো জরুরি। শুরুতে কিছুটা অস্বস্তি হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এতে শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

তবে ভয় ও প্রকৃত বিপদের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হবে। বৈদ্যুতিক সুইচ, কাঁচি ও ছুরির মতো বিপজ্জনক জিনিস থেকে শিশুকে অবশ্যই দূরে রাখতে হবে।

শিশু অন্ধকারে ঘুমাতে ভয় পেলে প্রথমে ঘরে হালকা আলো জ্বালিয়ে রাখুন। পরে ধীরে ধীরে আলোর উজ্জ্বলতা কমিয়ে আনুন।

কুকুরকে ভয় পেলে প্রথমে নিরাপদ দূরত্ব থেকে প্রাণীটিকে দেখতে দিন। এরপর শিশুর স্বাচ্ছন্দ্য অনুযায়ী ধীরে ধীরে কাছে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করুন।

জোর করে হঠাৎ ভয়ের মুখোমুখি করালে শিশুর আতঙ্ক আরও বেড়ে যেতে পারে। তাই সময় নিয়ে ধাপে ধাপে চেষ্টা করা উচিত।

শিশু ঠিক কী কারণে ভয় পাচ্ছে, তা বোঝার জন্য তাকে সহজ ও নির্দিষ্ট প্রশ্ন করুন।

যেমন, অন্ধকারে ঘরের আলমারিকে দৈত্য মনে হলে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, ‘আলো জ্বালালে কি আলমারির দৈত্যটা চলে যায়?’

চিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পেলে জানতে চান, ‘চিকিৎসকের কাছে গেলে ঠিক কোন বিষয়টি তোমার ভয় লাগে?’

আবার কুকুর, বিড়াল বা অন্য প্রাণীকে ভয় পেলে প্রশ্ন করতে পারেন, ‘এ প্রাণীটি কি কখনো তোমাকে দেখে তেড়ে এসেছিল?’

এ ধরনের প্রশ্ন শিশুকে নিজের ভয় প্রকাশ করতে সাহায্য করে। অনেক সময় ভয়ের পেছনে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনা বা কারণ থাকে। সেটি বুঝতে পারলে সমাধানের পথও সহজ হয়।

শিশুরা মা-বাবার আচরণ দেখে অনেক কিছু শেখে। কোনো পরিস্থিতিতে অভিভাবকেরা নিজেরাই উদ্বিগ্ন বা আতঙ্কিত হয়ে পড়লে শিশুও সেটিকে বিপজ্জনক বলে মনে করতে পারে।

তাই ভয়ের পরিস্থিতিতে সন্তানের সামনে শান্ত ও আত্মবিশ্বাসী থাকার চেষ্টা করুন। এতে শিশু পরিস্থিতি সামলানোর ইতিবাচক উদাহরণ পাবে।

ভয় পেলে শিশুর হৃৎস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে এবং শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়ে আসে। এমন পরিস্থিতিতে তাকে কিছুটা সময় দিন। তার পছন্দের খেলনা, জায়গা বা আনন্দের কোনো ঘটনা নিয়ে কথা বলুন।

শিশু কিছুটা স্বাভাবিক হলে সহজ শ্বাস-প্রশ্বাসের অনুশীলন শেখাতে পারেন। তাকে বলুন, ‘চলো, আমরা একটা নতুন খেলা শিখি। আমি যেভাবে ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছি এবং ছাড়ছি, তুমিও সেভাবে চেষ্টা করো।’

নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে শিশু ভয় বা উদ্বেগের মুহূর্তে নিজেকে শান্ত করতে শিখতে পারে।

ভয়ের কারণে শিশুর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হলে, সে অতিরিক্ত চুপচাপ হয়ে গেলে কিংবা বুক ধড়ফড়, শ্বাসকষ্ট বা শারীরিক অসুস্থতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

এ ধরনের লক্ষণ সাধারণ শৈশবকালীন ভয়ের চেয়ে গুরুতর কোনো সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে। তাই প্রয়োজন অনুযায়ী শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীর সহায়তা নেওয়া জরুরি।

সন্তানের ভয় দূর করার অর্থ তাকে সম্পূর্ণ ভীতিহীন করে তোলা নয়; বরং ভয়কে বুঝতে এবং তা মোকাবিলা করতে শেখানো। মা-বাবার ধৈর্য, সহানুভূতি ও ধারাবাহিক সহযোগিতায় শিশু নিজের ভেতরের সাহস খুঁজে পেতে পারে।

তথ্যসূত্র: চাইল্ড মাইন্ড ইনস্টিটিউট

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments