সম্পাদকীয়:
সমাজে একজন পুরুষকে প্রায়ই পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী, দায়িত্বশীল অভিভাবক কিংবা সংকটের সময় নির্ভরতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাঁর কাছে প্রত্যাশা থাকে, তিনি পরিবারের সব সমস্যা সামলাবেন, সবার প্রয়োজন পূরণ করবেন এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে দৃঢ় থাকবেন। কিন্তু এই প্রত্যাশার আড়ালে যে মানুষটি থাকেন, তাঁর অনুভূতি, মানসিক চাপ, ভয়, হতাশা ও ব্যক্তিগত স্বপ্নের কথা কতটা ভাবা হয়?
জীবনের একটি পর্যায়ে অনেক পুরুষের ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও স্বপ্ন পরিবারের প্রয়োজনের কাছে গৌণ হয়ে পড়ে। নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনার আগে তাঁকে ভাবতে হয় সন্তানের শিক্ষার খরচ, পরিবারের চিকিৎসা, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় কিংবা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখাশোনার কথা। কোথাও বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সংসারের হিসাব-নিকাশ তাঁকে থামিয়ে দেয়। নিজের প্রয়োজনকে পিছিয়ে দিয়ে পরিবারের চাহিদা পূরণ করাকেই তিনি দায়িত্ব বলে মনে করেন।
কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে নিজের প্রয়োজন ও অনুভূতি উপেক্ষা করার পরিণতি শুধু শারীরিক ক্লান্তিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। সংসারের আর্থিক চাপ, কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা, চাকরি হারানোর ভয়, ঋণের বোঝা, সামাজিক প্রত্যাশা এবং পারিবারিক দায়িত্ব, সব মিলিয়ে একজন পুরুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ ও মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। অনেক সময় এসব চাপ প্রকাশের সুযোগ না থাকায় তা জমতে থাকে। বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে তিনি হতাশা, একাকিত্ব কিংবা বিষণ্নতার সঙ্গে লড়াই করতে পারেন।
সমস্যার একটি বড় জায়গা আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। ছোটবেলা থেকেই অনেক ছেলেকে শেখানো হয়, পুরুষ মানুষ কাঁদে না, দুর্বলতা প্রকাশ করে না, সব পরিস্থিতিতে শক্ত থাকতে হয়। বড় হওয়ার পর সেই ধারণা আরও গভীর হয়। ফলে কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক সংকট কিংবা ব্যক্তিগত হতাশা—সবকিছু অনেক পুরুষ নীরবে বহন করেন। তাঁরা মনে করেন, নিজের কষ্টের কথা বললে পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হবেন, সামাজিকভাবে ছোট হতে হবে কিংবা নিজের দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
এই মানসিকতা বিপজ্জনক। কারণ দীর্ঘদিন আবেগ ও কষ্ট চেপে রাখলে মানসিক চাপ আরও জটিল হতে পারে। ঘুমের সমস্যা, অল্পতেই রেগে যাওয়া, কাজে মনোযোগ হারানো, মানুষের কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, সবকিছুতে আগ্রহ কমে যাওয়া কিংবা ক্রমাগত হতাশা—এসব লক্ষণকে শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা মেজাজের সমস্যা হিসেবে দেখা উচিত নয়। কখনো কখনো এগুলো মানসিক স্বাস্থ্যগত সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনার আরেকটি বাধা হলো, অনেকেই মানসিক চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং নেওয়াকে দুর্বলতা কিংবা লজ্জার বিষয় মনে করেন। অথচ শারীরিক অসুস্থতায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার মতোই মানসিক সমস্যায় বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়াও স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। দীর্ঘদিন বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অনিদ্রা কিংবা অসহায়ত্বের অনুভূতি থাকলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীর পরামর্শ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে পরিবার ও কাছের মানুষের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পুরুষের আত্মত্যাগের আলোচনা করতে গিয়ে পরিবারের অন্য সদস্যদের শ্রম ও অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সংসার পরিচালনায় নারীর অবৈতনিক শ্রম, সন্তান লালন-পালন, ঘরের কাজ এবং পরিবারের মানসিক যত্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবার টিকে থাকে পারস্পরিক দায়িত্ব, সহযোগিতা ও সম্মানের ভিত্তিতে; একক কোনো ব্যক্তির আত্মত্যাগের ওপর নয়।
পরিবারের উচিত উপার্জনকারী পুরুষটির প্রয়োজন ও অনুভূতির প্রতিও মনোযোগ দেওয়া। তিনি কেমন আছেন, কর্মক্ষেত্রে কী ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, কোনো বিষয় তাঁকে দুশ্চিন্তায় রাখছে কি না—এসব জানতে চাওয়া দরকার। শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, তাঁর মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়াও পারিবারিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর বিশ্রামের সময়, ব্যক্তিগত পছন্দ, বিনোদন এবং নিজের মতো করে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ থাকা প্রয়োজন। একইভাবে পুরুষেরও উচিত নিজের কষ্ট ও সীমাবদ্ধতার কথা পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া।
কর্মক্ষেত্রেও পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। অতিরিক্ত কাজের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা, বৈষম্য কিংবা অসম্মানজনক আচরণ একজন কর্মীর মানসিক সুস্থতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সুস্থ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, বিশ্রামের সুযোগ এবং প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানেরও দায়িত্ব।
একজন মানুষের মূল্য শুধু তাঁর উপার্জন, পদমর্যাদা কিংবা পরিবারের জন্য কতটা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। তাঁরও ব্যক্তিগত পরিচয় আছে, স্বপ্ন আছে, অনুভূতি আছে এবং নিজের মতো করে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
আমাদের বুঝতে হবে, পুরুষের কান্না দুর্বলতা নয়, ক্লান্তি অপরাধ নয়, আর সাহায্য চাওয়া পরাজয় নয়। পরিবারের সবাই যদি একজন পুরুষের ওপর নির্ভর করেন, তবে তাঁরও এমন একটি নিরাপদ পরিসর প্রয়োজন, যেখানে তিনি নির্দ্বিধায় নিজের ভয়, দুশ্চিন্তা ও অসহায়ত্বের কথা বলতে পারবেন। সেখানে তাঁকে বিচার করা হবে না; বরং বোঝার চেষ্টা করা হবে।
পুরুষের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা ভাঙতে হবে পরিবার থেকে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে, কর্মক্ষেত্র থেকে এবং সামগ্রিকভাবে সমাজ থেকে। কারণ একজন পুরুষ কেবল পরিবারের দায়িত্ব বহন করার যন্ত্র নন; তিনি অনুভূতিসম্পন্ন একজন মানুষ। তাঁর মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি তাঁর মৌলিক মানবিক প্রয়োজন। দায়িত্বের পাশাপাশি তাঁর প্রাপ্য ভালোবাসা, সম্মান, বিশ্রাম ও মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করাও আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক দায়িত্ব।



