ইসলাম ডেস্ক:
মানুষের জীবনে ভুল বোঝাবুঝি, অপমান, অন্যের রূঢ় আচরণ কিংবা কষ্ট পাওয়ার ঘটনা নতুন নয়। এসব অভিজ্ঞতা থেকে অনেক সময় মানুষের মনে ক্ষোভ ও প্রতিহিংসা তৈরি হয়। তবে সেই কষ্ট মনে পুষে রাখার পরিবর্তে ক্ষমা করার মানসিকতা মানুষকে উদার, সহনশীল ও মহৎ করে তোলে।
ক্ষমা করার অর্থ অন্যায়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা নয়; বরং প্রতিশোধের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করে নিজের অন্তরকে ঘৃণা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ক্ষমাশীলতার যে শিক্ষা দিয়েছেন, তা ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক ও সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেয়।
কোরআনের আলোকে ক্ষমাশীলতার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরা হলো—
১. ক্ষমাশীলদের ভালোবাসেন আল্লাহ
রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যের ভুল ক্ষমা করে দেওয়া সৎকর্মশীল মানুষের অন্যতম গুণ। প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যারা ক্ষমা করেন, আল্লাহ তাঁদের ভালোবাসেন।
আয়াতের উচ্চারণ: ওয়াল কাযিমিনাল গাইযা ওয়াল আফিনা আনিন নাস, ওয়াল্লাহু ইউহিব্বুল মুহসিনিন।
অর্থ: যারা ক্রোধ সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেয়। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।
(সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)
২. আল্লাহর ক্ষমা পেতে অন্যকে ক্ষমা করা
মানুষ নিজেই মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রত্যাশা করে। তাই অন্যের ভুলত্রুটি ক্ষমা করার মানসিকতাও নিজের মধ্যে গড়ে তোলা উচিত। ক্ষমা ও উদারতা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে সুন্দর করে।
আয়াতের উচ্চারণ: ওয়াল ইয়াফু ওয়াল ইয়াসফাহু, আলা তুহিব্বুনা আই ইয়াগফিরাল্লাহু লাকুম।
অর্থ: তারা যেন ক্ষমা করে এবং উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন?
(সুরা আন-নুর, আয়াত: ২২)
৩. ক্ষমা ও সংশোধনের প্রতিদান আল্লাহর কাছে
কোনো অন্যায়ের জবাবে প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমা করে সম্পর্ক বা পরিস্থিতির সংশোধনের চেষ্টা করা উত্তম। এমন ক্ষমার প্রতিদান আল্লাহর কাছে রয়েছে।
আয়াতের উচ্চারণ: ফামান আফা ওয়া আসলাহা ফা আজরুহু আলাল্লাহ।
অর্থ: অতঃপর যে ক্ষমা করে এবং সংশোধন করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে।
(সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ৪০)
৪. ধৈর্য ও ক্ষমা দৃঢ় সংকল্পের পরিচয়
অন্যের অন্যায় বা অপমানের মুখেও ধৈর্য ধারণ করা এবং প্রতিশোধের পরিবর্তে ক্ষমার পথ বেছে নেওয়া দুর্বলতা নয়। বরং এটি মানসিক দৃঢ়তা ও মহৎ চরিত্রের পরিচায়ক।
আয়াতের উচ্চারণ: ওয়া লামান সাবারা ওয়া গাফারা ইন্না যালিকা লামিন আযমিল উমুর।
অর্থ: আর যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে, নিশ্চয়ই তা দৃঢ় সংকল্পের কাজ।
(সুরা আশ-শুরা, আয়াত: ৪৩)
৫. ক্ষমার নীতি অবলম্বন ও অজ্ঞদের এড়িয়ে চলা
সব তর্কে জড়ানো কিংবা প্রতিটি কটু কথার জবাব দেওয়া প্রয়োজন নেই। অনেক সময় সংযম বজায় রাখা এবং অজ্ঞতাপূর্ণ আচরণ এড়িয়ে চলাই উত্তম।
আয়াতের উচ্চারণ: খুযিল আফওয়া ওয়া’মুর বিল উরফি ওয়া আ’রিদ আনিল জাহিলিন।
অর্থ: ক্ষমার নীতি অবলম্বন করো, সৎকাজের আদেশ দাও এবং অজ্ঞদের এড়িয়ে চলো।
(সুরা আল-আ’রাফ, আয়াত: ১৯৯)
৬. সুন্দরভাবে ক্ষমা করা
ক্ষমা শুধু মুখের কথা নয়; এর সঙ্গে থাকতে হয় উদারতা ও মানসিক প্রশান্তি। প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষকে প্রশ্রয় না দিয়ে সুন্দরভাবে ক্ষমা করার শিক্ষা দিয়েছে কোরআন।
আয়াতের উচ্চারণ: ফাসফাহিস সাফহাল জামিল।
অর্থ: সুতরাং তুমি সুন্দরভাবে ক্ষমা করো।
(সুরা আল-হিজর, আয়াত: ৮৫)
৭. ক্ষমা ও কোমল আচরণ মানুষের হৃদয় জয় করে
কঠোরতা মানুষের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে, আর কোমলতা ও ক্ষমাশীলতা সম্পর্ককে দৃঢ় করে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে সাহাবিদের প্রতি ক্ষমাশীল হতে এবং তাঁদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আয়াতের উচ্চারণ: ফা’ফু আনহুম ওয়াসতাগফির লাহুম।
অর্থ: সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা করো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করো।
(সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
৮. মন্দের জবাব উত্তম আচরণে দেওয়া
কেউ খারাপ আচরণ করলে তার জবাবে একই ধরনের আচরণ না করে উত্তম পন্থা অবলম্বন করা উচিত। উদারতা ও সুন্দর আচরণ অনেক সময় বিরোধিতার অবসান ঘটাতে পারে।
আয়াতের উচ্চারণ: ইদফা’ বিল্লাতি হিয়া আহসানুস সাইয়্যিআহ।
অর্থ: তুমি মন্দকে প্রতিহত করো উত্তম পন্থায়।
(সুরা আল-মুমিনুন, আয়াত: ৯৬)
৯. আল্লাহর ক্ষমাশীলতা থেকে শিক্ষা নেওয়া
মহান আল্লাহ অসীম ক্ষমতার অধিকারী। তাঁর ক্ষমাশীলতার গুণ থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষেরও অন্যের ভুল ক্ষমা করার মানসিকতা গড়ে তোলা উচিত।
আয়াতের উচ্চারণ: ইন তুবদু খাইরান আও তুখফুহু আও তা’ফু আন সুইন ফাইন্নাল্লাহা কানা আফুওওয়ান কাদিরা।
অর্থ: তোমরা যদি কোনো ভালো কাজ প্রকাশ করো অথবা গোপন রাখো কিংবা কোনো মন্দ ক্ষমা করে দাও, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, সর্বশক্তিমান।
(সুরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৯)
১০. অনুতপ্ত ব্যক্তির তওবা কবুল করা
কেউ নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হলে তাকে সংশোধনের সুযোগ দেওয়া উচিত। আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার শিক্ষা মানুষকেও অন্যের প্রতি উদার হতে অনুপ্রাণিত করে।
আয়াতের উচ্চারণ: ইন্নাল্লাহা হুওয়াত তাওওয়াবুর রাহিম।
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।
(সুরা আত-তাওবা, আয়াত: ১১৮)
ক্ষমাশীলতা হোক জীবনের চর্চা
ক্ষমা করার অর্থ এই নয় যে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে হবে কিংবা নিজের অধিকার বিসর্জন দিতে হবে। অন্যায়ের প্রতিকার চাওয়া এবং নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অধিকার মানুষের রয়েছে। তবে প্রতিহিংসা ও বিদ্বেষকে জীবনের চালিকাশক্তি না বানিয়ে ন্যায়সংগতভাবে ক্ষমা ও সংশোধনের পথ বেছে নেওয়াই কোরআনের শিক্ষার অন্যতম দিক।
পবিত্র কোরআনের এসব শিক্ষা ব্যক্তি ও সমাজজীবনে সহনশীলতা, উদারতা, ধৈর্য এবং সুন্দর আচরণের চর্চা বাড়াতে পারে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমাশীল, সহনশীল ও উদার হৃদয়ের মানুষ হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।



