Homeঅর্থনীতি১০ মাসে ৫৩১ টাকা বেড়েছে এলপিজির দাম, নির্ধারিত দামের বাইরে চলছে বাজার

১০ মাসে ৫৩১ টাকা বেড়েছে এলপিজির দাম, নির্ধারিত দামের বাইরে চলছে বাজার

তানভীর রায়হান:

বছরের শুরুতে ১ হাজার ৩০৬ টাকা। দশ মাসের ব্যবধানে সেই একই ১২ কেজির তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত দাম বেড়েছে ৫৩১ টাকা বা প্রায় ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে ভোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা সরকারি দামের চেয়েও ভিন্ন। নির্ধারিত মূল্যে বাজারে এলপিজি না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গত কয়েক মাসে কোথাও কোথাও ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতি মাসে যে দাম নির্ধারণ করছে, তার সঙ্গে খুচরা বাজারের প্রকৃত দামের বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) মাসভিত্তিক মূল্যতথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর এলপিজির দাম একদিকে যেমন কয়েক দফা বেড়েছে, অন্যদিকে কয়েক দফা কমেছেও। ফলে ভোক্তাদের জন্য বাজারে তৈরি হয়েছে এক ধরনের মূল্য-অনিশ্চয়তা।

জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ৩০৬ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে ৫০ টাকা বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। মার্চে ১৫ টাকা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৪১ টাকা। এরপর এপ্রিল থেকে শুরু হয় বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি। ওই মাসে এক লাফে ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৭২৮ টাকা।

মে মাসে আরও ২১২ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৪০ টাকা। এটিই চলতি বছরের এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সরকারি নির্ধারিত দাম। অর্থাৎ জানুয়ারির তুলনায় মাত্র চার মাসে সিলিন্ডারের দাম বেড়েছিল ৬৩৪ টাকা বা প্রায় ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ।

এরপর অবশ্য পরিস্থিতি পাল্টে যায়। জুনে দাম ৫৫ টাকা কমে হয় ১ হাজার ৮৮৫ টাকা। জুলাইয়ে আরও বড় পতন ঘটে, এক মাসে ৩৫৭ টাকা কমে দাম নেমে আসে ১ হাজার ৫২৮ টাকায়। অর্থাৎ মে থেকে জুলাই, মাত্র দুই মাসে দাম কমে ৪১২ টাকা।

কিন্তু জুলাইয়ের পর আবার ঊর্ধ্বমুখী হয় বাজার। আগস্টে ৭০ টাকা বেড়ে দাম হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। সেপ্টেম্বরে সামান্য কমে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা হলেও অক্টোবরে এসে বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। চলতি মাসে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি।

ফলে সেপ্টেম্বরে নির্ধারিত দামের তুলনায় অক্টোবরে এক মাসেই দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। আর জুলাইয়ের ১ হাজার ৫২৮ টাকা থেকে তিন মাসে বেড়েছে ৩০৯ টাকা বা প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ।

এলপিজির দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য, সৌদি কন্ট্রাক্ট প্রাইস (সৌদি সিপি), আমদানি ব্যয়, পরিবহনসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, বিইআরসি নির্ধারিত দাম এবং ভোক্তারা বাস্তবে যে দামে সিলিন্ডার কিনছেন, এই দুইয়ের মধ্যে এত বড় ব্যবধান কেন তৈরি হচ্ছে।

গত মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের সরকারি নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ বিভিন্ন এলাকায় তা ২ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হওয়ার অভিযোগ ওঠে। অর্থাৎ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভোক্তাকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে এক হাজার টাকারও বেশি দিতে হয়েছে।

এমনকি নির্ধারিত দামের চেয়েও বেশি টাকা দেওয়ার পরও কোথাও কোথাও সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছিল না বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে শুধু দাম নয়, বাজারে সরবরাহব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ভোক্তাদের বড় একটি অংশের অভিযোগ, প্রতি মাসে নতুন দাম ঘোষণা করা হলেও বাজারে সেই দামের বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করা হচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে দাম কমলেও তার সুফল যেমন ভোক্তারা সবসময় পান না, তেমনি দাম বাড়লে খুচরা পর্যায়ে তা আরও বেশি হারে বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এলপিজির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, দাম বাড়ানোর আগে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বাজার অস্থির করে ২৫২ টাকা দাম বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

সফিকুজ্জামান বলেন, সরকার যদি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে না পারে এবং ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো বেশি দামে বিক্রি করেন, তাহলে বাজার নিয়ন্ত্রণের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। উৎপাদন ব্যয় না বাড়লে অতিরিক্ত দামে বিক্রির কারণ এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

তবে এলপিজির বাজার নিয়ন্ত্রণে এবার কঠোর নজরদারির কথা জানিয়েছে বিইআরসি। কমিশনের সদস্য (গ্যাস) মো। মিজানুর রহমান জানান, ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে সেপ্টেম্বরে তাদের বিক্রির পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে এবং জেলা পর্যায় পর্যন্ত তদারকি করা হচ্ছে। নতুন দাম ঘোষণার পর বাজার মনিটরিং আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছর এলপিজির সরকারি দাম চার দফা কমলেও পাঁচ দফা বেড়েছে। সর্বনিম্ন ১ হাজার ৩০৬ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯৪০ টাকা পর্যন্ত ওঠানামা করেছে দাম। অক্টোবরের ১ হাজার ৮৩৭ টাকা এখনো মে মাসের সর্বোচ্চ দামের চেয়ে ১০৩ টাকা কম হলেও জানুয়ারির তুলনায় ৫৩১ টাকা বেশি।

এলপিজি এখন দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবারের রান্নার অন্যতম প্রধান জ্বালানি। বিশেষ করে যেসব এলাকায় পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ কম কিংবা সংযোগ নেই, সেসব পরিবারের জন্য বোতলজাত গ্যাসের বিকল্প সীমিত। ফলে সরকারি নির্ধারিত দামের পাশাপাশি খুচরা বাজারে প্রকৃত বিক্রয়মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি চাপ পড়বে ভোক্তার ওপর।

এ অবস্থায় শুধু প্রতি মাসে নতুন দাম ঘোষণা নয়, নির্ধারিত মূল্যে পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং অতিরিক্ত দামে বিক্রির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশীয় দামের সমন্বয় কতটা স্বচ্ছভাবে হচ্ছে, সেটিও ভোক্তাদের কাছে স্পষ্ট করা প্রয়োজন।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments