Homeজাতীয়শিক্ষকহীন শ্রেণিকক্ষেই কাটছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন

শিক্ষকহীন শ্রেণিকক্ষেই কাটছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন

তানভীর রায়হান:

শ্রেণিকক্ষ আছে, শিক্ষার্থী আছে, আছে বই-খাতা ও পরীক্ষা, শুধু নেই পর্যাপ্ত শিক্ষক। দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন বাস্তবতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রায় প্রতিটি স্তরেই শিক্ষকসংকট দীর্ঘ হচ্ছে।

ফলে কোথাও একজন শিক্ষককে একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, কোথাও আবার এক বিষয়ের শিক্ষক অন্য বিষয়ের ক্লাস নিচ্ছেন। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতিও বাড়ছে।

সোমবার বিশ্ব শিক্ষক দিবস। শিক্ষকতার মর্যাদা ও পেশাগত নিরাপত্তা নিয়ে নানা আয়োজনের মধ্যেই দেশের শিক্ষাব্যবস্থার এই বাস্তবতা সামনে এসেছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু শূন্য পদ পূরণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিশ্চিত করা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।

প্রাথমিক শিক্ষায় সংকটের বড় একটি কারণ দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকা। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের প্রায় ৩৬ হাজার পদ খালি রয়েছে। সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদও রয়েছে প্রায় ২ হাজার ২০০।

প্রধান শিক্ষক না থাকায় অধিকাংশ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে তাঁদের একটি বড় অংশকে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজ করতে হচ্ছে। এতে সরাসরি শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় কমে যাচ্ছে।

টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার খাজনাগড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এরই একটি উদাহরণ। বিদ্যালয়টিতে সহকারী শিক্ষকের পাঁচটি পদ থাকলেও কর্মরত মাত্র দুজন। তাঁদের একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে অন্য শিক্ষককে প্রায় সব শ্রেণির পাঠদান সামলাতে হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক পদে শূন্য থাকা প্রায় ৩৬ হাজার পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতি দেওয়া হলে তাঁদের বর্তমান পদও খালি হবে। তখন সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদ আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

মাধ্যমিক পর্যায়ে সংকটের ধরন কিছুটা ভিন্ন। এখানে শুধু মোট শিক্ষকসংখ্যা কম নয়, নির্দিষ্ট বিষয়েও শিক্ষক পাওয়া যাচ্ছে না। বিজ্ঞান, গণিত ও তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, এসব বিষয়ে ঘাটতি তুলনামূলক বেশি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৯৩টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৮৩টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। সহকারী শিক্ষকের তিন হাজারের বেশি পদও খালি রয়েছে।

ফলে অনেক বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, আইসিটি বা অন্য কোনো বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে ভিন্ন বিষয়ের শিক্ষককে। এতে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা ও পাঠদানের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

বরগুনা জিলা স্কুলে প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকসংকটও রয়েছে। বিদ্যালয়টিতে আইসিটি, কৃষি ও হিন্দু ধর্ম শিক্ষার জন্য পৃথক শিক্ষক নেই। বিজ্ঞান বিভাগেও শিক্ষকসংকট রয়েছে।

সরকারি কলেজগুলোর পরিস্থিতিও স্বস্তিদায়ক নয়। দেশে ৩১৬টি সরকারি কলেজে অনুমোদিত শিক্ষক পদ ১৫ হাজারের বেশি। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ১৭৮টি পদ শূন্য। আত্তীকৃত কলেজগুলোতেও দুই হাজারের বেশি প্রভাষকের পদ খালি রয়েছে।

শহরের তুলনায় গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের কলেজগুলোতে সংকট আরও তীব্র। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদিনা ফজলুল হক সরকারি কলেজে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। অথচ ৪২টি শিক্ষক পদের মধ্যে ২১টিই শূন্য। রসায়ন, দর্শন ও আইসিটি বিষয়ে সেখানে কোনো স্থায়ী শিক্ষক নেই।

নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে শিক্ষার্থী প্রায় দুই হাজার। তাঁদের জন্য সরকারি আইসিটি শিক্ষক মাত্র একজন। বাধ্যতামূলক এই বিষয়ের পাঠদান চালিয়ে নিতে অতিথি শিক্ষক নিয়োগের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজও এই সংকটের বাইরে নয়। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে প্রায় ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থীর জন্য আইসিটি শিক্ষক নেই। ফলে অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের দিয়েই আইসিটির ক্লাস চালাতে হচ্ছে।

এমপিওভুক্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষকসংকট প্রকট। চলতি বছরের সপ্তম বিশেষ গণবিজ্ঞপ্তিতে ৬৭ হাজার ২০৮টি শিক্ষক ও প্রভাষক পদের বিপরীতে মাত্র ১১ হাজার ৭১৩ জনকে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়। ফলে ৫৫ হাজার ৪৯৫টি পদই শূন্য থেকে যায়।

বর্তমানে এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে প্রায় ৬০ হাজার ২৯৫টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য প্রার্থী না পাওয়াও সংকটের অন্যতম কারণ।

এই ঘাটতি সাময়িকভাবে মোকাবিলায় সরকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নিয়ে একটি পুল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। গত ১২ এপ্রিল জারি করা অফিস আদেশ অনুযায়ী, স্থানীয় প্রশাসনের পরামর্শ ও প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে পুল থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের সাময়িকভাবে নিয়োগ দেওয়া যাবে।

দক্ষ জনশক্তি তৈরির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র কারিগরি শিক্ষাতেও একই চিত্র। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনুমোদিত শিক্ষক পদ রয়েছে ১৫ হাজার ৮৪৪টি। এর মধ্যে ৮ হাজার ৪৮৬টি পদ শূন্য। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের অর্ধেকের বেশি এখনো পূরণ হয়নি।

শিক্ষক সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ওপর। নিয়মিত ক্লাস না হওয়া, প্রয়োজনীয় বিষয়ের শিক্ষক না থাকা কিংবা অনভিজ্ঞ শিক্ষক দিয়ে পাঠদান চালানোর কারণে অনেক শিক্ষার্থী বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা অর্জন থেকে পিছিয়ে পড়ছে।

বরগুনা জিলা স্কুলের এক শিক্ষার্থীর ভাষায়, শিক্ষকসংকটের কারণে একই শিক্ষককে একাধিক বিষয়ে ক্লাস নিতে হচ্ছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের কঠিন বিষয়গুলো বুঝতে শিক্ষার্থীদের সমস্যা হচ্ছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, একটি শিক্ষাবর্ষে যে শিখন ঘাটতি তৈরি হয়, পরবর্তী সময়ে তা পূরণ করা কঠিন। তাই শিক্ষকসংকটকে কেবল শূন্য পদ পূরণের প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। কোন এলাকায় কত শিক্ষক প্রয়োজন, কোন বিষয়ে কতজন শিক্ষক দরকার এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষক ধরে রাখতে কী ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিতে হবে, এসব বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে।

বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই শিক্ষককে সম্মান জানানোর পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হয়ে উঠেছে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত ও যোগ্য শিক্ষক নিশ্চিত করা। কারণ শিক্ষক ছাড়া অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষা কার্যক্রম পূর্ণতা পায় না; আর সেই ঘাটতির দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হয় শিক্ষার্থীদেরই।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments