Homeঅর্থনীতি৩০৪ কোটি টাকার ঋণ: পুরোনো নিষ্পত্তির নথি, নতুন করে কেন প্রশ্ন

৩০৪ কোটি টাকার ঋণ: পুরোনো নিষ্পত্তির নথি, নতুন করে কেন প্রশ্ন

তানভীর রায়হান:

সংযুক্ত আরব আমিরাতে জনতা ব্যাংকের ৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নথি ও হিসাবের দুই রকম ছবি। ব্যাংক বলছে, এটি নতুন কোনো অনিয়মের ঘটনা নয়; দীর্ঘ আইনি ও সালিসি প্রক্রিয়া শেষে ২০০৩ সালেই ঋণটির দায় নিষ্পত্তি হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শনে একই ইউএই কার্যক্রমে বিপুল অঙ্কের ঋণ অবলোপন, হিসাবের অসঙ্গতি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতার তথ্য উঠে এসেছে।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, তিন দশকের বেশি পুরোনো ওই ঋণের নিষ্পত্তি কীভাবে হিসাবের খাতায় প্রতিফলিত হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে অবলোপনের যে প্রক্রিয়া হয়েছে, তা কতটা নিয়ম মেনে হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্র এখন শুধু ঋণটি আদায় হয়েছে কি না, তা নয়; বরং এর নিষ্পত্তি, অবলোপন ও হিসাবরক্ষণ, এই তিনটি ধাপের মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমান দাবি করেন, ইউএই কার্যক্রম নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনায় কিছু তথ্যগত বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ খলিফা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ফাইন্যান্স মরিস ও মেট্রোপলিটন এন্টারপ্রাইজের ঋণটি বহু পুরোনো। পাওনা আদায়ের চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়া ও সালিসে গড়ায়। পরে দুই দেশের সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সম্মতির ভিত্তিতে ২০০৩ সালে এর দায় নিষ্পত্তি করা হয়।

ব্যাংকের দাবি অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালের সালিসি আদালতের নির্দেশনার পরই বিষয়টি নিষ্পত্তির দিকে এগোয়। অর্থাৎ জনতা ব্যাংকের ব্যাখ্যায় ৩০৪ কোটি টাকার এই হিসাবকে সাম্প্রতিক কোনো সিদ্ধান্তের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে ইউএইর চার শাখার ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও বিস্তৃত চিত্র পাওয়া গেছে। সেখানে ২৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মোট প্রায় ২০ কোটি ৫১ লাখ দিরহাম, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪৩৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা ঋণ অবলোপনের তথ্য উঠে এসেছে।

এই মোট অঙ্কের মধ্যে শেখ খলিফা-সংশ্লিষ্ট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১৪ কোটি ২৮ লাখ ৮০ হাজার দিরহাম, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ আলোচনার কেন্দ্রে থাকা ৩০৪ কোটি টাকা আসলে ইউএইতে অবলোপিত মোট ঋণের একটি অংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনের আরেকটি তথ্যও বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। সেখানে প্রায় ৬৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকার একটি ঋণ ‘ভুলক্রমে’ অবলোপনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে ইউএই শাখাগুলোর ঋণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ একদিকে জনতা ব্যাংক ৩০৪ কোটি টাকার ঋণকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হওয়া দায় হিসেবে ব্যাখ্যা করছে, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদনে একই কার্যক্রমের আওতায় অন্যান্য ঋণ অবলোপন এবং হিসাব ব্যবস্থাপনায় অসঙ্গতির বিষয় উঠে এসেছে।

তবে এসব তথ্যের ভিত্তিতে ৩০৪ কোটি টাকার ঋণকে সরাসরি অবৈধ বা দুর্নীতির অর্থ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। বরং আসল প্রশ্ন হলো, ঋণ নিষ্পত্তির যে নথির কথা ব্যাংক বলছে, সেটি কি বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে পাওয়া হিসাবের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ কেবল ঋণ অবলোপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ইউএই শাখাগুলোর হিসাব ব্যবস্থাপনায়ও বেশ কিছু অসঙ্গতি চিহ্নিত করা হয়েছে।

শারজাহ শাখার সান্ড্রি ডিপোজিট ও সান্ড্রি অ্যাসেটের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্যের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুবাই শাখার বিভিন্ন হিসাবেও গরমিল পাওয়া গেছে।

একটি ব্যাংকের বিদেশি শাখায় এ ধরনের হিসাবগত অসঙ্গতি কেন তৈরি হলো, কত দিন ধরে ছিল এবং এগুলো নিয়মিত অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষায় ধরা পড়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরও এখন গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ বিদেশে পরিচালিত ব্যাংকিং কার্যক্রমে স্থানীয় আইন মেনে চলার পাশাপাশি মূল ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও কার্যকর থাকার কথা। সেখানে হিসাবের বড় ধরনের পার্থক্য থাকলে নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে ইউএই সিইও কার্যালয়ের ছয়টি ল্যাপটপ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জনতা ব্যাংক অবশ্য বলেছে, ল্যাপটপগুলোর অস্তিত্ব রয়েছে এবং সেগুলো দাপ্তরিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ ছাড়া তিন ভারতীয় নাগরিকের নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। ব্যাংকের ব্যাখ্যা, ইউএইতে স্থানীয় কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে ১৯৮২ সালের সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে এবং এ ধরনের নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমতি প্রয়োজন ছিল না।

ইতালিতে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) বন্ধ না করার বিষয়েও ব্যাংক ব্যাখ্যা দিয়েছে। ব্যাংকের ভাষ্য, প্রবাসী আয়, দেশের ভাবমূর্তি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনার বিষয় বিবেচনায় প্রতিষ্ঠানটি চালু রাখা হয়েছে।

৩০৪ কোটি টাকার ঋণ নিয়ে জনতা ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্যের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আসলে ঋণটি অস্তিত্বশীল ছিল কি না, তা নিয়ে নয়। বিতর্কটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ঋণটির শেষ পরিণতি এবং হিসাবের উপস্থাপন নিয়ে।

জনতা ব্যাংকের বক্তব্য সত্য হলে ২০০৩ সালেই বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ওই নিষ্পত্তির সরকারি অনুমোদন, সালিসি সিদ্ধান্ত, ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নথি এবং পরবর্তী হিসাবরেকর্ড, সবগুলো পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকার কথা।

অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে যদি পরবর্তী সময়ে ঋণটি অবলোপনের তথ্য থাকে, তাহলে সেই অবলোপনের ভিত্তি, অনুমোদন এবং হিসাবরক্ষণ কীভাবে করা হয়েছিল, সেটিই যাচাইয়ের বিষয়।

তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ২০০৩ সালের নিষ্পত্তির নথি এবং পরবর্তী সময়ের ব্যাংক হিসাব পাশাপাশি পরীক্ষা করা। নথিগুলোর ধারাবাহিকতা পরিষ্কার হলেই বোঝা যাবে, ৩০৪ কোটি টাকার ঘটনা কেবল বহু পুরোনো একটি ঋণের আইনগত নিষ্পত্তি, নাকি এর সঙ্গে ইউএই কার্যক্রমে চিহ্নিত বৃহত্তর হিসাবগত দুর্বলতারও কোনো সম্পর্ক রয়েছে।

কারণ প্রশ্নটি এখন শুধু ‘ঋণটি মাফ হলো কি না’, এতটুকুতে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন হলো, যে অর্থের দায় ২০০৩ সালে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে ব্যাংক দাবি করছে, সেটি পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের হিসাব ও অবলোপনের খাতায় কীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সেই উত্তরই বিতর্কের আসল জায়গাটি পরিষ্কার করতে পারে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments