রায়হান আহমেদ:
দেশের ব্যাংক খাতে সংকট সামাল দিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে একদিকে বিপুল তারল্য সহায়তা দিতে হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে খেলাপি ঋণ ও লোকসানের বোঝা। চলতি বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা হিসেবে ৮৪ হাজার ৯৪৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সময়ে ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসান দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে উপস্থাপিত মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে ব্যাংক খাতের এই চিত্র উঠে এসেছে। গতকাল রোববার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দেশের আর্থিক খাতের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুধু লোকসান কিংবা তারল্যসংকটই নয়, ব্যাংক খাতের আরেকটি বড় চাপ খেলাপি ঋণ। গত ৩০ জুন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮১ হাজার ২৩৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। মোট ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের হার ৩১ দশমিক ৪১ শতাংশ। তিন মাস আগে মার্চে এই পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার ১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ তিন মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ১৩১ কোটি ৯২ লাখ টাকা।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার আরেকটি দিকও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ছিল ৭৮৯ কোটি টাকা। কিন্তু প্রভিশনসহ বিভিন্ন ব্যয় সমন্বয়ের পর নিট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ব্যাংকগুলো পরিচালন পর্যায়ে আয় করলেও পুরোনো ঋণের ঝুঁকি, প্রভিশন ঘাটতি এবং অন্যান্য ব্যয় সেই আয়কে ছাপিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উচ্চ শ্রেণিকৃত ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ, মূলধন ঘাটতি ও দুর্বল সম্পদমান ব্যাংকগুলোর উপার্জন সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে পরিচালন মুনাফা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অনেক ব্যাংক লোকসানে চলে যাচ্ছে।
মার্চ ২০২৬ ভিত্তিতে ব্যাংক খাতের সম্পদের বিপরীতে আয় হার ঋণাত্মক ১ দশমিক ০৩ শতাংশ। মূলধনের ওপর আয় বা ROE-ও ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ২২ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক রয়েছে। বিশেষায়িত ব্যাংকের মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক রয়েছে।
বেসরকারি খাতের লোকসানি ব্যাংকের তালিকায় রয়েছে এবি ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বিদেশি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান।
এই ২২ ব্যাংকের সম্মিলিত পুঞ্জীভূত লোকসান ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা।
তারল্য সংকট সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংককে ‘ল্যান্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ হিসেবে এগিয়ে আসতে হয়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২টি ব্যাংককে ডিমান্ড লোন বা জরুরি তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ১৫ হাজার ৮১০ কোটি ৩২ লাখ টাকা। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৮৪২ কোটি ৭৯ লাখ, এক্সিম ব্যাংককে ১২ হাজার ১০ কোটি ২৫ লাখ এবং ন্যাশনাল ব্যাংককে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংক পেয়েছে ৫ হাজার ৪২১ কোটি ১৬ লাখ এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পেয়েছে ৩ হাজার ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ব্যাংক ব্যবস্থায় মোট তরল সম্পদের পরিমাণও বেড়েছে। আগস্ট ২০২৬ শেষে নগদ ও সরকারি সিকিউরিটিজসহ মোট তরল সম্পদ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৫ লাখ কোটি টাকা। এক বছর আগে একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ১ লাখ কোটি টাকা।
তবে বিপুল এই তারল্য পুরো ব্যাংক খাতে সমানভাবে ছড়িয়ে নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ প্রচলিত ধারার ব্যাংকে পর্যাপ্ত তারল্য থাকলেও কিছু ব্যাংক এবং অধিকাংশ ইসলামী ধারার ব্যাংক এখনো তারল্য সংকটে রয়েছে।
খেলাপি ঋণের চাপ কমাতে ১০ শতাংশের বেশি শ্রেণিকৃত ঋণ রয়েছে, এমন ব্যাংকের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে আলোচনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পাশাপাশি খেলাপি ঋণ আদায়ে বাধাগুলো চিহ্নিত করে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে কর্মপরিকল্পনাও নেওয়া হচ্ছে।
তবে মূলধন পরিস্থিতিও উদ্বেগের। মার্চ ২০২৬ ভিত্তিতে ৪০টি তফসিলি ব্যাংক ন্যূনতম প্রয়োজনীয় মূলধন সংরক্ষণ করতে পারলেও ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
বৈঠকে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর এমপি সাইফুল আলম ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর প্রস্তাব তুলে ধরে বলেন, দেশে প্রায় ৬৩টি ব্যাংক রয়েছে; এত সংখ্যক ব্যাংকের প্রয়োজন আছে কি না, তা বিবেচনা করা দরকার।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ছাড়া চেয়ারম্যান বা পরিচালনা পর্ষদের অপসারণের সুযোগ থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে এনসিপির এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ অর্থঋণ ও উচ্চ আদালতে আটকে থাকা ৭৪ হাজার ৬৭৯টি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। প্রয়োজনে এসব মামলার জন্য পৃথক বেঞ্চ গঠনের কথাও বলেন তিনি।
তিনি আরও প্রস্তাব দেন, খেলাপি ঋণের মূল অর্থ পরিশোধ না করা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে নতুন ঋণ দেওয়ার সুযোগ বন্ধ রাখতে হবে।
সংসদীয় কমিটির বৈঠকে উঠে আসা তথ্য বলছে, ব্যাংক খাতের সমস্যা এখন আর শুধু কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে খেলাপি ঋণ পাঁচ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, অন্যদিকে লোকসানি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত ক্ষতি আড়াই লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি। তারল্য সংকট মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিপুল সহায়তাও দিতে হচ্ছে। ফলে ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা ফেরাতে শুধু জরুরি অর্থ জোগান নয়, খেলাপি ঋণ আদায়, মূলধন শক্তিশালী করা, ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং আটকে থাকা ঋণসংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


