Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: র‍্যাঙ্কিং, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়: র‍্যাঙ্কিং, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন

তানভীর রায়হান:

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাব্যবস্থায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক শিক্ষার পরিবেশ, ইংরেজিমাধ্যমে পাঠদান, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং কর্মমুখী শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও অর্জন করেছে। একইভাবে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ভূমিকা রাখছে।

তবে এই দুই ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: বিশ্ববিদ্যালয়ের সাফল্য কি শুধু র‍্যাঙ্কিং, অবকাঠামো ও চাকরির বাজারে সুনামের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হবে, নাকি এর ভেতরের পরিবেশ, গবেষণার মান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে?

প্রশ্নটি বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত মান নির্ধারণের জন্য বাহ্যিক সাফল্যের পাশাপাশি তার অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম সম্পর্কেও নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা প্রয়োজন।

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবেশের মধ্যে একটি পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক ক্ষেত্রে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, ডিন, প্রক্টর, রেজিস্ট্রার, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ পাওয়া যায়। অবশ্য সেখানেও সাক্ষাৎ পেতে বিলম্ব, প্রশাসনিক বাধা কিংবা বক্তব্য দিতে অনীহার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় যে সাংবাদিকদের জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত, তা-ও নয়।

অন্যদিকে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রবেশ বা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে জনসংযোগ বিভাগের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলা হয়। প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়ার দায়িত্ব বণ্টনের জন্য জনসংযোগ বিভাগ থাকা অস্বাভাবিক নয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজনীয়ও হতে পারে। কিন্তু এই ব্যবস্থা যদি সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সরাসরি যোগাযোগের পথ কার্যত বন্ধ করে দেয়, তাহলে তা স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করে।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো নয়। এটি জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তিনির্ভর আলোচনার কেন্দ্র। ফলে সেখানে কী ঘটছে, শিক্ষার্থীরা কী ধরনের সুযোগ পাচ্ছেন, গবেষণার পরিবেশ কেমন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হচ্ছে—এসব বিষয়ে জানার আগ্রহ জনস্বার্থের অংশ।

একটি বিশ্ববিদ্যালয় তার নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম বজায় রেখেও সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। সাক্ষাৎকারের সময় নির্ধারণ, তথ্যের লিখিত অনুরোধ, নির্ধারিত সময়ে বক্তব্য প্রদান এবং অভিযোগের জবাব দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সাংবাদিকতা ও প্রশাসন, উভয়ের কাজই সহজ হয়। অতএব, জনসংযোগ বিভাগ থাকা সমস্যা নয়; সমস্যা তখনই, যখন সেটি তথ্যপ্রাপ্তির একমাত্র দরজা হয়ে ওঠে এবং সেই দরজাও কার্যকরভাবে বন্ধ থাকে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে একটি বহুল আলোচিত যুক্তি হলো, আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিংয়ে তাদের কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এই অর্জনকে অবজ্ঞা করার কারণ নেই। আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি, গবেষণার প্রভাব, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কিংবা শিক্ষাসংক্রান্ত সক্ষমতার ইঙ্গিত দিতে পারে।

তবে সব র‍্যাঙ্কিং একই পদ্ধতিতে তৈরি হয় না। কোনো র‍্যাঙ্কিংয়ে গবেষণার উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, একাডেমিক সুনাম কিংবা শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। অন্য কোনো মূল্যায়নে ভিন্ন সূচক প্রাধান্য পেতে পারে। তাই কোন বিশ্ববিদ্যালয় কত নম্বরে রয়েছে, তা দেখার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট র‍্যাঙ্কিংয়ের পদ্ধতি ও সূচকও বুঝতে হবে।

একইভাবে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সাংবাদিকের প্রবেশাধিকার সীমিত হওয়া মানেই প্রতিষ্ঠানটি নিম্নমানের, এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। আবার সাংবাদিকদের প্রবেশের সুযোগ রয়েছে বলেই কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক, সেটিও নিশ্চিত নয়।

কিন্তু র‍্যাঙ্কিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জনকারী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, গবেষণার পরিবেশ, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আর্থিক জবাবদিহি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা অবশ্যই যুক্তিসংগত। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং একটি মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে দুটিই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নতুন কিছু নয়। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও আবাসনসংকট, সেশনজট, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক জটিলতা, গবেষণার সীমাবদ্ধতা কিংবা শিক্ষকদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ ওঠে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও টিউশন ফি, অতিরিক্ত ব্যয়, বৃত্তি, ক্রেডিট স্থানান্তর, ফলাফল, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষা কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।

এসব অভিযোগের কোনোটি সত্য হতে পারে, কোনোটি আংশিক সত্য হতে পারে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুল বোঝাবুঝি বা ব্যক্তিগত অসন্তোষও থাকতে পারে। তাই দু-একজন শিক্ষার্থীর বক্তব্যের ভিত্তিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে চূড়ান্ত নেতিবাচক সিদ্ধান্ত দেওয়া সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অভিযোগের গুরুত্ব ও প্রমাণের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ, একাধিক শিক্ষার্থীর বক্তব্য নেওয়া, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বা সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার তথ্য যাচাই এবং কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করা দরকার। অভিযোগের জবাব দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগও দিতে হবে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যদি বক্তব্য দিতে অস্বীকৃতি জানায়, সে কারণে অনুসন্ধান থেমে থাকতে পারে না। সাংবাদিককে প্রাপ্ত নথি, স্বাধীন সূত্র ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে যথাসম্ভব নিরপেক্ষভাবে প্রতিবেদন তৈরি করতে হবে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য চাওয়া হয়েছে কি না এবং তারা কী প্রতিক্রিয়া দিয়েছে, তা প্রয়োজনে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা যেতে পারে।

অর্থাৎ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশাধিকার সীমিত হলেও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা অসম্ভব নয়। তবে প্রবেশাধিকার ও তথ্যপ্রাপ্তির বাধা অনুসন্ধানকে কঠিন করে তোলে এবং তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ কমিয়ে দিতে পারে। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আলোচনায় প্রশাসনিক ক্ষমতার ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে উপাচার্যকে প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা, অর্থায়ন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে বোর্ড অব ট্রাস্টিজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, উপাচার্যের ক্ষমতার সীমা কী, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সিদ্ধান্তের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হয় এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অন্যান্য অংশীজনের স্বার্থ রক্ষার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য প্রভাবশালী হলেই তিনি এককভাবে সব সিদ্ধান্ত নেন, এমন সাধারণীকরণ করা ঠিক হবে না। একইভাবে, বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সব সিদ্ধান্তও যে কেবল আর্থিক স্বার্থে পরিচালিত হয়, এমন প্রমাণ ছাড়া দাবি করা যায় না। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনগত কাঠামো, পরিচালনাপদ্ধতি ও বাস্তব পরিস্থিতি আলাদা হতে পারে।

তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা কার হাতে রয়েছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ক্ষমতা কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে এবং তার জবাবদিহি কোথায়। নিয়োগ, পদোন্নতি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের ফি নির্ধারণ, বৃত্তি প্রদান ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা দরকার। এসব নীতিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা যাচাই করার কার্যকর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

উপাচার্যের বেতন-ভাতা কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির বেতন বেশি হলেই অনিয়ম হয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়। দেখতে হবে, নিয়োগ ও পারিশ্রমিক নির্ধারণের প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের অনুমোদন যথাযথভাবে হয়েছে কি না এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে ব্যয়ের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না।

একইভাবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তারও যথাযথ হিসাব থাকা উচিত। শিক্ষার্থীরা শুধু সেবা গ্রহণকারী নন; তাঁদের অর্থেই একটি বড় অংশের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। তাই তাঁদের স্বার্থ রক্ষা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কার্যকর হওয়া জরুরি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার, গবেষণা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, পুরস্কার ও শিক্ষার্থীদের সাফল্যের তথ্য সংবাদমাধ্যমে পাঠায়। এসব সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার একটি স্বাভাবিক মাধ্যম। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মন্ত্রণালয়, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সংস্থাও একই পদ্ধতি অনুসরণ করে।

কিন্তু সংবাদ বিজ্ঞপ্তি এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা এক বিষয় নয়। বিজ্ঞপ্তি সাধারণত প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে। সেখানে সাফল্যের বিবরণ থাকলেও সমস্যার আলোচনা না-ও থাকতে পারে। অন্যদিকে, সংবাদকর্মীর দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা, প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তোলা, বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশ করা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ইতিবাচক ফিচার প্রকাশিত হওয়া স্বাভাবিক। তবে শুধু অর্জনভিত্তিক ফিচার কিংবা জনসংযোগ বিভাগের সরবরাহ করা তথ্যের ওপর নির্ভর করে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায় না। একইভাবে, সংবাদমাধ্যমে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কম প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই সেখানে অনিয়ম রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না।

এখানে গণমাধ্যমের নিজস্ব দায়িত্বও রয়েছে। সংবাদমাধ্যম কি পর্যাপ্ত অনুসন্ধান করছে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট, গবেষণা, শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতিবেদন নিয়ে নিয়মিত কাজ হচ্ছে কি? নাকি সময়, জনবল ও অর্থের সীমাবদ্ধতায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষিত থাকছে? এসব প্রশ্নও সংবাদমাধ্যমের ভেতরে আলোচনা করা প্রয়োজন।

কোনো প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন বা সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠালেই তার ইতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করতে হবে, এমন বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত নয়। আবার কোনো প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন দেয় না বলে তার বিরুদ্ধে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশ করাও অনৈতিক। সংবাদ নির্বাচন ও প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রমাণ, জনস্বার্থ এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।

গবেষণা, এমফিল ও পিএইচডি: প্রকৃত ঘাটতি কোথায়?

বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে গবেষণার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদিত কর্মসূচি নেই বা সীমিত। ফলে সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অনেকেই অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।

এতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান খারাপ প্রমাণিত হয় না। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষকরা অন্য প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। মূল প্রশ্ন হলো, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব গবেষণার পরিবেশ কতটা গড়ে তুলেছে, শিক্ষকদের গবেষণায় সময় ও অর্থ বরাদ্দ করছে কি না, মানসম্মত গবেষণাপত্র প্রকাশে সহায়তা দিচ্ছে কি না এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করছে কি না।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার সক্ষমতা বিচার করতে হলে গবেষণা অনুদান, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, গবেষণাপত্রের মান, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গবেষণার ফলাফল সমাজে কতটা প্রভাব ফেলছে—এসব বিষয় দেখতে হবে। উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদন না থাকা এবং গবেষণায় দুর্বলতা এক বিষয় নয়; তবে গবেষণার সুযোগ সীমিত থাকলে তা প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

এখানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে কী ধরনের উচ্চতর ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদন রয়েছে, কোথায় গবেষণার অবকাঠামো কেমন এবং নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করা হচ্ছে কি না—এসব তথ্য সহজে পাওয়া গেলে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংবাদমাধ্যমের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে কি সরকারি করা উচিত?

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ক্ষমতা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কোনো কোনো মহল থেকে সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত করার ধারণা সামনে আসতে পারে। এই প্রস্তাবের পেছনে শিক্ষাকে জনস্বার্থের বিষয় হিসেবে দেখার যুক্তি রয়েছে। কিন্তু বাস্তবায়নের প্রশ্নে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে সরকারি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে বিপুল অর্থের প্রয়োজন হবে। জমি, ভবন, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, অবকাঠামো, চলমান শিক্ষা কার্যক্রম, ঋণ বা আর্থিক দায় এবং পরিচালনাপদ্ধতি—সবকিছুর হিসাব করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠাতাদের আইনগত অধিকার, শিক্ষার্থীদের চলমান শিক্ষা, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

রাষ্ট্রের তদারকি বাড়ানোর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অবিলম্বে সরকারি করতে হবে। বরং প্রথম ধাপে বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ, আর্থিক নিরীক্ষা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নিষ্পত্তি, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে।

যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে আইন ও মানদণ্ড লঙ্ঘন করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে, যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরি করছে, তাদের স্বায়ত্তশাসন ও ইতিবাচক উদ্যোগও সংরক্ষণ করা জরুরি।

রাষ্ট্রের ভূমিকা হওয়া উচিত জনস্বার্থ রক্ষা করা, মান নিশ্চিত করা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানো। মালিকানা পরিবর্তন সব সমস্যার সমাধান নয়; কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানেও অনিয়ম দেখা দিতে পারে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে কয়েকটি পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।

প্রথমত, নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ এবং সাক্ষাৎকার গ্রহণের কার্যকর ব্যবস্থা রাখতে হবে। জনসংযোগ বিভাগ তথ্য সমন্বয় করবে, কিন্তু সেটি যেন বৈধ ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্নের পথে অপ্রয়োজনীয় বাধা না হয়ে দাঁড়ায়।

দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো, অনুমোদিত শিক্ষাক্রম, শিক্ষক নিয়োগের নীতিমালা, আর্থিক নিরীক্ষার সারসংক্ষেপ, গবেষণা কার্যক্রম ও শিক্ষার্থীদের অভিযোগ নিষ্পত্তি সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনগত সীমাবদ্ধতা রক্ষা করেই এ ধরনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব।

তৃতীয়ত, উপাচার্য ও বোর্ড অব ট্রাস্টিজের ক্ষমতা এবং দায়িত্ব স্পষ্ট করতে হবে। নিয়োগ, আর্থিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বার্থের সংঘাত থাকলে তা চিহ্নিত করার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মীদের অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও কার্যকর পথও থাকা দরকার।

চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে শুধু অনুমোদন বা আনুষ্ঠানিক পরিদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ, আর্থিক স্বচ্ছতা ও অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে। মূল্যায়নের মানদণ্ড প্রকাশ্য হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে।

পঞ্চমত, সংবাদমাধ্যমকেও সরকারি ও বেসরকারি, উভয় ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমান পেশাগত মান বজায় রেখে কাজ করতে হবে। প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ প্রকাশ করা যাবে না, আবার প্রশাসনিক বাধার কারণে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রশ্ন থেকেও সরে আসা যাবে না। প্রতিষ্ঠানের সাফল্য যেমন সংবাদ, তেমনি প্রমাণিত অনিয়মও সংবাদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা শুধু তার নাম, ভবন, শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিংবা আন্তর্জাতিক র‍্যাঙ্কিং দিয়ে নির্ধারিত হয় না। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত শক্তি বোঝা যায় তার শিক্ষার মান, গবেষণার পরিবেশ, মুক্তবুদ্ধির চর্চা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতা থেকে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের উচ্চশিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সেই অবদান আরও কার্যকর করতে হলে তাদের বিরুদ্ধে অযাচিত সন্দেহ তৈরি করা যেমন অনুচিত, তেমনি তাদের কার্যক্রমকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখাও গ্রহণযোগ্য নয়। একই মানদণ্ড সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।

আমার বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় বা ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা নয়। বরং যে প্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব পালন করে, তার কার্যক্রম সম্পর্কে প্রশ্ন করার সুযোগ থাকা দরকার। সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার, তথ্যের স্বচ্ছতা, গবেষণার মান এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি—এসবকে প্রতিপক্ষের দাবি হিসেবে নয়, একটি সুস্থ উচ্চশিক্ষাব্যবস্থার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে দেখতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় যত ভালোই হোক, সেটি প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। আবার প্রশ্ন তোলার অধিকার মানে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করার স্বাধীনতাও নয়। স্বাধীন সাংবাদিকতা, দায়িত্বশীল প্রশাসন এবং কার্যকর রাষ্ট্রীয় তদারকির সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে এমন একটি উচ্চশিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে র‍্যাঙ্কিংয়ের পাশাপাশি বাস্তব মান, প্রচারের পাশাপাশি প্রমাণ এবং ক্ষমতার পাশাপাশি জবাবদিহিও সমান গুরুত্ব পাবে।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments