Homeবিবিধউপ-সম্পাদকীয়রবীন্দ্রনাথের ধর্মপরিচয়: পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের ধর্ম

রবীন্দ্রনাথের ধর্মপরিচয়: পরিচয়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের ধর্ম

তানভীর রায়হান

ধর্ম কী, জন্মসূত্রে পাওয়া পরিচয়, পারিবারিক ঐতিহ্য, নাকি ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব বিশ্বাস ও জীবনদর্শন? এই প্রশ্নটি নতুন নয়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো একজন বিশ্বকবির ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে প্রশ্নটি নতুন করে সামনে আসে। কারণ, তাঁর জীবন ও সাহিত্য আমাদের শেখায়, মানুষকে কেবল একটি ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে আবদ্ধ করে তার সম্পূর্ণ সত্তাকে বোঝা যায় না।

রবীন্দ্রনাথের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য প্রচলিত রয়েছে। কেউ তাঁকে হিন্দু বলেন, কেউ ব্রাহ্ম, আবার কেউ তাঁর চিন্তার মানবতাবাদী ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের সমালোচনামূলক দিকগুলো সামনে এনে তাঁকে নাস্তিক হিসেবে চিহ্নিত করতে চান। কিন্তু ইতিহাস, জীবনী ও তাঁর নিজের রচনার আলোকে বিচার করলে দেখা যায়, এসব পরিচয়ের কোনো একটিকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া তাঁর চিন্তার ব্যাপ্তিকে যথাযথভাবে তুলে ধরে না।

রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস হিসেবে বর্তমান বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলের পিঠাভোগ গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়। তাঁদের পারিবারিক পদবি ছিল কুশারী। পরবর্তী সময়ে ঠাকুর পরিবারের পূর্বপুরুষেরা কলকাতায় বসতি স্থাপন করেন। পরিবারটি বাঙালি হিন্দু ব্রাহ্মণ সমাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে পিরালি ব্রাহ্মণ পরিচয়ের কারণে তাঁদের পরিবারকে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের একাংশের কাছ থেকে সামাজিক বৈষম্য ও অবজ্ঞার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বলে ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়।

রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন উনিশ শতকের বাংলার ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। রাজা রামমোহন রায়ের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি একেশ্বরবাদী ধর্মচিন্তার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ব্রাহ্মধর্ম প্রচলিত মূর্তিপূজার বিরোধিতা করত এবং উপনিষদীয় দর্শন ও ঈশ্বরের একত্বের ধারণাকে গুরুত্ব দিত।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণের অর্থ এই নয় যে তিনি হিন্দু ঐতিহ্যের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন। ব্রাহ্মসমাজের আদিব্রাহ্ম শাখা নিজেদের হিন্দু ঐতিহ্যের সংস্কারক হিসেবেও দেখত। ফলে ব্রাহ্মধর্ম ও হিন্দুধর্মকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন দুটি পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়।

এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে ধর্মবিশ্বাস ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি সংশয়কে আলাদা করে দেখতে হবে।

শৈশব থেকেই রবীন্দ্রনাথ এমন একটি পারিবারিক পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে ধর্মীয় আলোচনা, উপনিষদীয় দর্শন ও ব্রাহ্মসমাজের কার্যক্রম ছিল গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ বয়সে তিনি আদিব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এসব তথ্য তাঁর ধর্মীয় জীবন ও চিন্তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার প্রমাণ।

তবে জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে তাঁর ধর্মভাবনা আরও স্বাধীন, গভীর ও মানবকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। তিনি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বাহ্যিকতা, সংকীর্ণতা এবং মানুষের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টিকারী প্রবণতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কাছে মানুষের মর্যাদা, প্রেম, সৌন্দর্য, প্রকৃতি এবং বিশ্বমানবতার উপলব্ধি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তাই তাঁকে নিছক নাস্তিক বলে ঘোষণা করা যেমন কঠিন, তেমনি তাঁর সমগ্র চিন্তাকে কেবল প্রচলিত ধর্মীয় কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করাও অসম্পূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের ধর্মভাবনা নিয়ে গবেষকদের মধ্যেও ভিন্নমত রয়েছে। কেউ তাঁর শেষ জীবনের মানবকেন্দ্রিক দর্শনে নাস্তিকতার সম্ভাব্য ইঙ্গিত দেখেছেন; অন্যরা তাঁর চিন্তায় ঈশ্বর, অসীম সত্তা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধির ধারাবাহিকতা খুঁজে পেয়েছেন।

১৯৩০ সালে অক্সফোর্ডে প্রদত্ত তাঁর হিবার্ট বক্তৃতা পরে The Religion of Man নামে প্রকাশিত হয়। বাংলায় তাঁর ‘মানুষের ধর্ম’ বিষয়ক চিন্তাও এই দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। এসব রচনা দেখায়, ধর্ম নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান কোনো একটি পরিচয়ে স্থির হয়ে থাকেনি; বরং অভিজ্ঞতা, মানবিকতা ও দর্শনের আলোকে ক্রমাগত বিকশিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ পর্যায়ের কবিতা ‘প্রথম দিনের সূর্য’ নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে অনেকে তাঁর ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত টানেন। কবিতাটিতে প্রথম দিনের সূর্য অস্ত যাওয়ার মুহূর্তে মানুষের প্রশ্ন, সময়ের প্রবাহ এবং জীবনের অর্থ নিয়ে গভীর দার্শনিক অনুসন্ধান রয়েছে।

কিন্তু কোনো কবিতার রূপক, প্রশ্ন কিংবা সংশয়কে সরাসরি কবির ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের চূড়ান্ত ঘোষণা হিসেবে গ্রহণ করা সাহিত্য পাঠের সঠিক পদ্ধতি নয়। কবিতা কোনো আত্মজীবনীমূলক হলফনামা নয়; তার ভাষা ও বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট, প্রতীক এবং দার্শনিক তাৎপর্য বিবেচনা করতে হয়।

একইভাবে রবীন্দ্রনাথের ‘শিবাজী উৎসব’ কবিতাকে তাঁর হিন্দু পরিচয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহার করা যায় না। কবিতাটি শিবাজীকে কেন্দ্র করে রচিত হলেও এর রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এবং ঐক্য প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা বিবেচনা করা জরুরি। কোনো ঐতিহাসিক চরিত্রকে নিয়ে কবিতা লেখা মানেই সেই চরিত্রের ধর্মীয় পরিচয়কে নিজের একমাত্র পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করা নয়।

অতএব, রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতা দিয়ে তাঁকে নাস্তিক কিংবা অন্য একটি কবিতা দিয়ে তাঁকে নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা তাঁর সাহিত্য ও চিন্তার বহুমাত্রিকতাকে সংকুচিত করে।

রবীন্দ্রনাথের ধর্মচিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। তিনি এমন এক মানবিক জগতের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে জন্ম, ধর্ম, জাতপাত কিংবা সম্প্রদায়ের পরিচয় মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করবে না।

তাঁর সাহিত্য বারবার আমাদের সামনে এনেছে মানুষের মুক্তি, স্বাধীন চিন্তা, প্রেম, প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক এবং সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রশ্ন। এই কারণেই তাঁর সাহিত্য কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সম্পদ নয়; এটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের পাশাপাশি বিশ্বের নানা সংস্কৃতির পাঠকের কাছেও তাৎপর্যপূর্ণ।

এ প্রসঙ্গে আরেকটি সতর্কতা প্রয়োজন। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু কিংবা ইন্দিরা গান্ধীর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক থাকলেও তাঁদের পরিচয় সম্পর্কে প্রমাণ ছাড়া সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে রবীন্দ্রনাথের ধর্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক বা সামাজিক বিতর্ককে ইতিহাসের বিকল্প হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম কী ছিল, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমে তাঁর পারিবারিক পরিচয়, ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে সম্পর্ক, ধর্মবিষয়ক প্রবন্ধ, কবিতা, বক্তৃতা এবং সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত চিন্তাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

ঐতিহাসিকভাবে তিনি হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; তাঁর বাবা ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের প্রধান নেতাদের একজন; আর রবীন্দ্রনাথ নিজে ধর্ম, ঈশ্বর, মানুষ ও বিশ্বজগতের সম্পর্ক নিয়ে আজীবন চিন্তা করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে একটি সরল অভিধায় বেঁধে ফেলা তাই যথেষ্ট নয়।

রবীন্দ্রনাথকে জানার প্রকৃত পথ তাঁর ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কে জয়ী হওয়া নয়, বরং তাঁর চিন্তার গভীরে প্রবেশ করা। তিনি কোন পরিচয়ে জন্মেছিলেন, কোন মতাদর্শের সংস্পর্শে এসেছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ ও জীবনকে কীভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর একসঙ্গে খুঁজলেই তাঁর জীবনদর্শনের পূর্ণতর ছবি পাওয়া সম্ভব।

একজন কবির মহত্ত্ব তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর মহত্ত্ব প্রকাশ পায় মানুষের চিন্তা, অনুভূতি ও বিবেককে কতটা প্রসারিত করতে পেরেছেন, তার মধ্যে। রবীন্দ্রনাথের উত্তরাধিকার আমাদের সেই বৃহত্তর মানবিকতার দিকেই আহ্বান জানায়।

-গবেষক ও গণমাধ্যম কর্মী।

RELATED ARTICLES
- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments