তানভীর রায়হান:
সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যাকাণ্ডের ১৪ বছর পেরিয়ে গেলেও খুনি শনাক্ত হয়নি। হত্যার উদ্দেশ্যও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি তদন্ত সংস্থা। তবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩০০টি সিডি ঘিরে নতুন করে তদন্তের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব সিডিতে থাকা অডিও, ভিডিও, কথোপকথন ও ডিজিটাল তথ্যের মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সূত্র থাকতে পারে বলে হাইকোর্টে দাখিল করা তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিন্তু নতুন তথ্যের সম্ভাবনা তৈরি হলেও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও মেলেনি। কে বা কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল, কেন সাংবাদিক দম্পতিকে হত্যা করা হয়েছিল এবং ঘটনাস্থলে পাওয়া অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ কার, এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়নি।
গত ২৭ অক্টোবর হাইকোর্টে সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া প্রায় ৩০০টি সিডির মধ্যে ৯০টির মূল্যায়ন শেষ হয়েছে। বাকি ২১০টি সিডি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব আলামত থেকে পাওয়া তথ্যের প্রাসঙ্গিকতা ও গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে আরও সময় প্রয়োজন বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছে থাকা সংশ্লিষ্ট তথ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তরের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে তথ্য পাওয়া এবং তা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত করে প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। তদন্ত কর্মকর্তাদের এখন ডিজিটাল আলামতের সত্যতা, প্রাসঙ্গিকতা এবং মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করতে হবে।
তদন্ত প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া ডিএনএ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাগরকে বাঁধার জন্য ব্যবহৃত চাদর এবং রুনির টি-শার্ট থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় অজ্ঞাত দুই পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়।
ঘটনাস্থলে মোট চারজনের ডিএনএ শনাক্ত করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে সাগর ও রুনির পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে। বাকি দুই পুরুষের পরিচয় এখনও অজানা। সন্দেহভাজন ও আসামিদের ডিএনএর সঙ্গে এসব নমুনার মিল খোঁজার চেষ্টা করা হলেও কোনো মিল পাওয়া যায়নি।
ডিএনএ থেকে সম্ভাব্য মুখচ্ছবি তৈরির উদ্যোগও সফল হয়নি। নমুনায় একাধিক ডিএনএ মিশে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট পরীক্ষাগারগুলো মুখচ্ছবি তৈরি করতে পারেনি। ফলে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই আলামত এখনও চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহের কারণে একজনকে হত্যার পর অন্যজন আত্মহত্যা করেছেন, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দুজনকেই হত্যার তথ্য উঠে এসেছে। অর্থ, জমিজমা, ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা সাগরের কর্মস্থলকেন্দ্রিক বিরোধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণও তদন্তে পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জিয়াউল আহসান এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি এবং হত্যাকাণ্ডে তাঁদের সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছায়নি তদন্ত সংস্থা। সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল আলামত ও তথ্য-উপাত্ত তদন্তের জন্য হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হলেও প্রতিবেদন দাখিলের সময় পর্যন্ত সেগুলো পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘ তদন্তের পরও মামলার অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আগে থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ এবং র্যাব তদন্ত করলেও রহস্যের সমাধান হয়নি। ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট র্যাবকে তদন্ত থেকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দেন।
সর্বশেষ শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ আরও এক বছর সময় চাইলেও বাদীপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শিশির মনির এত দীর্ঘ সময় দেওয়ার বিরোধিতা করেন। শুনানি শেষে হাইকোর্ট তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন। আগামী বছরের ২৯ এপ্রিল তদন্তের অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসায় খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। পরদিন তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
এখন প্রায় ৩০০টি সিডি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও তদন্তের সাফল্য নির্ভর করছে সেগুলো থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই, অজ্ঞাত ডিএনএর পরিচয় শনাক্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ীদের চিহ্নিত করার ওপর। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে এবার তদন্ত কতটা এগোয়, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



