নিজস্ব প্রতিনিধি:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় প্রতিবাদ জানাতে নিজের কার্যালয় থেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সরিয়ে নিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা। তিনি বলেছেন, সিদ্ধান্তটি কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়; বরং নিজের নৈতিক অবস্থান থেকেই নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক শামীমা বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা, গ্রেপ্তার, গুলি ও হত্যার ঘটনাগুলো তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। ওই পরিস্থিতিতে তার বিবেক তাকে ছবিটি কার্যালয়ের দেয়ালে রাখার অনুমতি দেয়নি।
তিনি বলেন, ‘এটি ছিল আমার নৈতিকবোধ থেকে ব্যক্তিগত প্রতিবাদের একটি বহিঃপ্রকাশ। আমি মনে করেছি, এই ছবিটি আর আমার অফিসের দেয়ালে ঝুলে থাকা উচিত নয়।’
অধ্যাপক শামীমার ভাষ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ের আন্দোলনে তার সম্পৃক্ততা হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে আসছেন। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সমর্থন দিয়েছিলেন বলে জানান।
২০২৪ সালের ১৫ জুলাইয়ের ঘটনাকে তিনি আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন। তার দাবি, ওই রাতে উপাচার্যের বাসভবনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার পর তিনি আর নীরব থাকার সুযোগ দেখেননি। পরে অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে তিনি প্রতীকী প্রতিবাদে অংশ নেন এবং আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার চেষ্টা করেন।
আন্দোলনের সময় নিজের কার্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখার কথাও জানান এই অধ্যাপক। তার ভাষ্য, সংকটের সময় শিক্ষার্থীরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারতেন। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের যোগাযোগের সুবিধার জন্য অফিসের ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগও দেওয়া হয়েছিল।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের মৃত্যুর খবরসহ পরবর্তী সময়ের প্রাণহানির ঘটনাগুলো তার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করে বলে জানান অধ্যাপক শামীমা।
শেখ হাসিনার ছবি সরানোর সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, এটি আবেগের বশে নেওয়া কোনো তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল না। তার ব্যক্তিগত উপলব্ধি ছিল, নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ এবং তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগে অভিযুক্ত একটি সরকারের প্রতিকৃতি তিনি নিজের কার্যালয়ে রাখতে চান না।
তবে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিণতি নিয়ে ভয় ছিল কি না—এমন প্রশ্নে অধ্যাপক শামীমা বলেন, তরুণদের জীবন ঝুঁকিতে পড়া ও প্রাণ হারানোর ঘটনা দেখার পর তার কাছে ভয়ের চেয়ে দায়িত্ববোধ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ১ আগস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে তাকে নিজের কার্যালয়ে বসা অবস্থায় দেখা যায়। তার পেছনের দেয়ালে শেখ হাসিনার ছবি না থাকায় ছবিটি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।
অধ্যাপক শামীমার দাবি, এরপর তাকে বিভিন্নভাবে হয়রানির মুখে পড়তে হয়। গালিগালাজ করে ফোন, হুমকির বার্তা, ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে তাকে হেয় করার চেষ্টা করা হয়। তার বিরুদ্ধে লিফলেট বিতরণ করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তবে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে সেই নোটিশ পাননি। ৫ আগস্টের পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে পরিবর্তন এলে নতুন উপাচার্য ওই সিদ্ধান্ত বাতিল করেন বলে জানান তিনি।
নিজের নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো অনুতাপ নেই বলেও জানান অধ্যাপক শামীমা। তার মতে, শেখ হাসিনার ছবি সরিয়ে ফেলা কোনো ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি ছিল তার অবস্থানের প্রতীকী প্রকাশ। একজন শিক্ষক হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন।


