দখলবাজির রাজনীতি নয়, জবাবদিহির রাজনীতি চাই
শেখ মিজানুর রহমান:
রাজনীতি যখন মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার পরিবর্তে দখল, চাঁদাবাজি কিংবা ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা। রাজধানীর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ তাই নিছক একটি অপরাধের ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনাটির সঙ্গে যদি রাজনৈতিক প্রভাব, জমি দখলের চেষ্টা কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের যোগসূত্র প্রমাণিত হয়, তাহলে তা রাজনীতির জন্য আরও বড় সতর্কবার্তা।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর একটি বড় জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে হামলা বা সেটিকে দখলের চেষ্টা হলে তার প্রভাব পড়ে সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর। বিশেষ করে নিম্নআয়ের মানুষ, নারী ও শিশুদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হলে তার দায় কেবল হামলাকারীদের নয়; সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও নিতে হয়। এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে জবাবদিহি।
কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তি অপরাধে জড়িত হলে দলীয় পরিচয় তার জন্য ঢাল হতে পারে না। একইভাবে কোনো জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযোগের তদন্ত হতে হবে নিরপেক্ষভাবে, প্রমাণের ভিত্তিতে। তদন্তে অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে, সেটিই আইনের শাসনের মৌলিক শর্ত।
রাজনীতির সবচেয়ে বড় সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন দলীয় আনুগত্যকে আইনের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী হলে অপরাধের দায় এড়ানো যাবে, আর বিরোধী দলের হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে, এমন দ্বৈত মানদণ্ড কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তাই রাড্ডার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে-ই অভিযুক্ত হোক, তার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, অপরাধে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণই হওয়া উচিত বিচারের প্রধান ভিত্তি।
একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দল যদি নিজেদের নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্তের সুযোগ দেয়, প্রমাণিত অপরাধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয় এবং প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়, তাহলে সেটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত হতে পারে।
কিন্তু শুধু দল থেকে বহিষ্কার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। অপরাধের অভিযোগ যদি গুরুতর হয়, তাহলে আইনগত প্রক্রিয়াও চলতে হবে। দলীয় শাস্তি এবং রাষ্ট্রীয় বিচার, দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বা জমি দখলের চেষ্টা যদি রাজনৈতিক প্রভাবের মাধ্যমে করা হয়, তাহলে সেটি শুধু ভূমি-সংক্রান্ত অপরাধ নয়; এটি জনগণের অধিকার হরণেরও শামিল। হাসপাতাল, স্কুল, এতিমখানা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা সামাজিক সেবাকেন্দ্র, এসব জায়গা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র হতে পারে না।
রাজনৈতিক ক্ষমতা মূলত জনগণের দেওয়া একটি সাময়িক দায়িত্ব। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা রাজনৈতিক দলের কর্মী—কেউই রাষ্ট্রীয় বা জনসম্পদের মালিক নন। তাঁরা জনগণের আমানত রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই জায়গায় ক্ষমতার অপব্যবহার হলে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
তবে একই সঙ্গে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিচার থেকেও সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ঘটনায় কারও নাম আলোচনায় এলেই তিনি অপরাধী হয়ে যান না। অভিযোগ, তদন্ত, প্রমাণ এবং বিচার, এই চারটি ধাপের পার্থক্য সাংবাদিকতা ও জনআলোচনায় স্পষ্ট থাকা দরকার। কারণ ভুলভাবে কাউকে অভিযুক্ত করলে প্রকৃত অপরাধীর বিরুদ্ধে তদন্তও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
রাড্ডা-কাণ্ডের প্রকৃত শিক্ষা এখানেই। এটি কোনো ব্যক্তি বা একটি দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণার বিষয় হওয়া উচিত নয়। বরং এ ঘটনা সামনে রেখে প্রশ্ন উঠতে হবে, জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে? রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দখল বা চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলে তদন্ত কতটা স্বাধীন হবে? এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে শাস্তি নিশ্চিত হবে কি না?
সরকারের জনপ্রিয়তা শুধু অর্থনীতি, উন্নয়ন কিংবা অবকাঠামো দিয়ে বিচার করা হয় না। একজন সাধারণ নাগরিক রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন কি না, থানায় গিয়ে ন্যায়বিচার পাচ্ছেন কি না এবং কোনো ক্ষমতাবান ব্যক্তি তার সম্পদ বা অধিকার কেড়ে নিতে পারছেন কি না, এসবও রাষ্ট্রের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
রাজনৈতিক দলগুলোর জন্যও এখন সময় এসেছে আত্মশুদ্ধির। ক্ষমতার সঙ্গে সুযোগসন্ধানী মানুষের সম্পর্ক তৈরি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু সেই প্রবণতাকে প্রশ্রয় দিলে একসময় দলের আদর্শ, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং জনআস্থা, সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
রাজনীতিতে ত্যাগের জায়গা দখল করে যদি ব্যক্তিস্বার্থ নেয়, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়। দলীয় পরিচয় যদি মানুষের সেবা করার পরিবর্তে প্রভাব বিস্তারের লাইসেন্সে পরিণত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের রাজনীতির প্রতি আস্থা কমে যায়।
সুতরাং রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্য উদ্ঘাটন জরুরি। যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, দখল কিংবা সন্ত্রাসের সুযোগ যাতে তৈরি না হয়, সে জন্য প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক—দুই পর্যায়েই কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
রাজনীতির শক্তি ক্ষমতায় নয়, মানুষের আস্থায়। আর সেই আস্থা টিকিয়ে রাখার একমাত্র পথ হলো, অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধকে গুরুত্ব দেওয়া।
রাড্ডা-কাণ্ড যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত, জনসম্পদের সুরক্ষা এবং দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করার দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে, তাহলেই একটি নিন্দনীয় ঘটনা থেকে রাষ্ট্র ও রাজনীতি একটি ইতিবাচক শিক্ষা নিতে পারবে।
-ম্যানেজিং এডিটর
সিএনএস২৪নিউজডটকম


